ইসরাইল : অচ্ছুৎ এক রাষ্ট্রের গর্ভপাত

জাতিগতভাবে ইহুদিরা অবাধ্য, সন্দেহপ্রবণ, কৃপণ, ষড়যন্ত্রপ্রিয় এবং স্বার্থ চরিতার্থে সকল নীচতা তাদের কাছে তুচ্ছ। এ কথা ঐতিহাসিকভাবে সত্য। ইহুদিদের প্রধান নবি মুসা আ.-এর সময়কাল থেকে শুরু করে বিগত তিন হাজার বছরের ইতিহাস যদি দেখা হয় তাহলে ইতিহাসের অসংখ্য দলিলে পাওয়া যাবে তাদের বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস। পৃথিবীর কোথাও তাদের বীরত্বপূর্ণ কোনো ইতিহাস লেখা হয়নি। কোনো ইহুদি বীরযোদ্ধার শোনিতগাথা অঙ্কিত হয়নি যুদ্ধ কিংবা সমরের এপিটাফে। এটাই সত্য। কিন্তু যদি ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত, বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস তালাশ করা হয় তবে ইহুদিদের শত শত দস্তাবেজ আপনার চোখের সামনে খুলে যাবে। আরব এবং ইউরোপের সহস্র বছরের ইতিহাস কালো হয়ে আছে ইহুদিদের অসংখ্য চক্রান্ত, গুপ্তহত্যা আর বিশ্বাসঘাতকতার কালিতে।


খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় তিন হাজার বছর আগে মিসরের দাসজীবন থেকে মুক্ত করে নবি মুসা আ. ইহুদিদের ভূমধ্যসাগর পার করে নিয়ে আসেন তাদের পিতৃপুরুষ নবি ইয়াকুব আ.-এর মাতৃভূমি ফিলিস্তিনে। ফিলিস্তিনে এসে তিনি তাদের যুদ্ধের মাধ্যমে এ ভূমি জয় করার জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। কিন্তু কাপুরুষ ইহুদিরা নবিকে বলে, ‘তুমি এবং তোমার আল্লাহ গিয়ে যুদ্ধ করো, আমরা এখানে বসে রইলাম।’


এমন হঠকারী মন্তব্যের পরও নবি মুসা আ. তাদের জন্য স্থানীয় আমালেকা সম্প্রদায়কে পরাজিত করে ফিলিস্তিন এলাকায় তাদের আবাসনের ব্যবস্থা করেন। কিন্তু ফিলিস্তিনের সেই ভূমি হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল কিছুদিনের মধ্যেই। এরপর থেকে মোটামুটি যাযাবরবৃত্তিই ছিল তাদের নিয়তি। দৌঁড়ের ওপর থাকতে হয়েছে তাদের যুগ যুগ ধরে। যেখানেই গিয়েছে, যেখানেই নতুন বসতি গড়েছে সেখান থেকেই তাদের তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কে না মেরেছে তাদের? মিসরের ফারাওরা ছিল তাদের জাতশত্রু, সুযোগ পেলেই বাড়িঘর থেকে উৎখাত করে দিত। এছাড়াও সাসানিদ, রোমান, পারসিক, মেসিডোনিয়ান, বাইজেন্টাইনসহ ইতিহাসের প্রায় সকল রাজবংশের সম্রাটরাই তাদের রাজ্য থেকে বিতাড়ন করেছে ইহুদিদের। ব্যবিলনের সম্রাট নেবুচাদনেজার খ্রিষ্টপূর্ব ৫৯৫ অব্দে জেরুজালেম আক্রমণ করে পুরো শহর এবং ইহুদিদের সকল ধর্মীয় উপাসনালয় ভেঙে গুঁড়িয়ে দেন এবং নগরের নারী, পুরুষ ও শিশুদের দাস হিসেবে ব্যবিলনে তাড়িয়ে নিয়ে যান। ঐতিহাসিকদের মতে, তাড়িয়ে নেওয়া এই দাসের সংখ্যা ছিল ৭০ হাজার।


মুসলিমদের সাথে তাদের ধর্মীয় শত্রুতা যতটা না, খ্রিষ্টানদের সঙ্গে তাদের ধর্মীয় শত্রুতা তার থেকেও অধিক এবং বহু পুরনো। বিগত ২০০০ বছরের খ্রিষ্টীয় ইতিহাসে আরব এবং ইউরোপের অধিকাংশ খ্রিষ্টান সম্রাটই ইহুদিদেরকে তাদের দেশ থেকে নানাভাবে অপদস্থ করে তাড়িয়ে দিয়েছে। জাতি হিসেবে একপ্রকার অস্পৃশ্যই মনে করা হতো তাদের।


স্পেন থেকে মুসলিমদের বিতাড়নের ইতিহাস পাঠকমাত্রই জানেন। কিন্তু এ কথা অনেকেই জানেন না, ১৫০২ খ্রিষ্টাব্দে মুসলমানদের স্পেন থেকে বিতাড়িত করার আগে ১৪৯২ সালে স্পেন থেকে সমস্ত ইহুদিকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। রাজা ফার্দিনান্দের পক্ষ থেকে মুসলিমদের জন্য শর্ত ছিল : স্পেনে থাকতে হলে খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণ করে থাকতে হবে অথবা লোকসমক্ষে তারা কোনো ধরনের মুসলিম ধর্মীয় কার্যাদি প্রদর্শন করতে পারবে না। কিন্তু ইহুদিদের জন্য সে শর্তও দেওয়া হয়নি। তাদের ওপর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল : যেসব ইহুদি ধর্মান্তরিত কিংবা দেশান্তর হবে না তাদেরকে বিনাবিচারে হত্যা করা হবে।



দুই

আজ শুনতে অদ্ভুত লাগলেও উনবিংশ তৎপূর্ববর্তী শতাব্দীর বাস্তবতা ছিল, ইউরোপের যে কোনো খ্রিষ্টান দেশ থেকেই ইহুদিদের দুর দুর করে তাড়িয়ে দেওয়া হতো। তারা ছিল অচ্ছুৎ জাতিবিশেষ। আজকের দিনে হরিজন, মুচি, বেদে, সাপুড়ে সম্প্রদায়কে যেভাবে আমাদের সমাজে আলাদা করে দেখা হয়, তাদের বাসস্থান যেভাবে গ্রামের একপাশে আলাদাভাবে চিহ্ণিত থাকে তেমনি ইউরোপে ইহুদিদেরও এভাবে অচ্ছুৎ করে রাখা হতো।


এই তো দেড়শো বছর আগেও ১৮৮২ সালে রাশিয়া এবং রোমানিয়া থেকে ইহুদিদের সমূলে উৎখাত করা হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কেন হিটলার ১ লাখ মতান্তরে ৫০ লাখ (!) ইহুদিকে হত্যা করেছিলেন? (এই তথ্যের কোনো ভিত্তি নেই। অনলাইন তথ্যকেন্দ্র উইকিপিডিয়ায় এই সংখ্যাকে ১ লাখ থেকে ৫০ লাখ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ১ থেকে ৫০-এর মাঝখানে বিস্তর ফারাকটাই সন্দেহের কারণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস লেখা হয়েছে ইহুদি সেন্টিমেন্টকে করুণা দেখিয়ে। পরিকল্পিতভাবে ইহুদিদের নিহতের সংখ্যা বাড়িয়ে বলা হয় পশ্চিমাবিশ্বে তাদের প্রতি করুণা দেখানোর জন্য এবং এই কাজে বিশ্বের ইহুদি-লবি সফল!) অনেক পণ্ডিতব্যক্তিই উত্তর দেবেন, ইহুদিদের সম্পদ আত্মসাৎ এবং তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য দখল করতেই হিটলার ইহুদিদের ওপর গণহত্যা চালিয়েছিলেন। এটি মোটামুটি ধরনের মিথ্যাকথা। ব্যবসা-বাণিজ্য দখলের জন্য গণহারে লাখ লাখ ইহুদি হত্যার প্রয়োজন পড়ে না। ঘৃণা জিনিসটা সবার বোঝা উচিত! 


একটু উদ্যোগী হলেই অনলাইনে ইউরোপের ইহুদিদের বিতাড়নের ইতিহাস পড়ে দেখতে পারি। একটি জাতিকে কেন সারা পৃথিবী থেকে দুর দুর করে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, নিজেদের কোন বদস্বভাবের কারণে তারা আরব-ইউরোপে অচ্ছুৎ হয়ে বসবাস করেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী-এই ইতিহাস না জানলে জার্মানির হলোকাস্ট, ফিলিস্তিনের ইন্তিফাদা এবং বিশ্ববাসীর ঘৃণার অনেক কিছুই অজ্ঞাত রয়ে যাবে।


সব রাষ্ট্রের কাছে অচ্ছুৎ এই ইহুদি জাতিকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে শুরু করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত সময়ে ব্রিটেন, ফ্রান্স, আমেরিকা ধীরে ধীরে ফিলিস্তিনে পুশইন করে। ইউরোপিয়ানরা যে কোনোভাবে এদের ইউরোপছাড়া করলেই যেন বাঁচে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের ইহুদিনিধন তাদের সামনে আরও বড় সুযোগ তৈরি করে দেয়। যুদ্ধ ও যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে জাহাজভর্তি করে ইহুদিদের ঢেলে দেওয়া হয় ফিলিস্তিনের মাটিতে। ফিলিস্তিন তখন ব্রিটেন ও ফ্রান্সের উপনিবেশে ছিল। আরবদের বলা হয়, এটাই ইহুদিদের আবাসভূমি। এখানেই তাদের ধর্মের গোড়াপত্তন হয়েছিল। জাতিসংঘও তাই বলল। সাধারণ পরিষদে প্রহসনের ভোটাভুটিও হয়ে গেল। ফিলিস্তিন ভেঙে দু-টুকরো করে গড়া হলো ইহুদি ধর্মরাষ্ট্র : ইসরাইল। শুরু হলো শতাব্দীর দীর্ঘতম আরব-ইসরাইল কনফ্লিক্ট।



তিন

ধর্মভিত্তিক ভূখণ্ড কি বর্তমান সভ্য দুনিয়া কবুল করে নিয়েছে? বর্তমান ইহুদিআশ্রিত ইসরাইলিদের আপনি ধর্মের দোহাই দিয়ে ফিলিস্তিনের বিস্তর ভূমি দান করলেন। কোন যুক্তিতে? ধর্মের যুক্তিতে? তাহলে অন্য দুই ধর্ম- খ্রিষ্ট ও মুসলিম ধর্মের লোকজন কী অপরাধ করল? তাদের ধর্মীয় অবদান কি কম আছে ফিলিস্তিনের ওপর? তারাও সমানভাবে এই ভূখণ্ডের দাবিদার। তাহলে পশ্চিম কেন ইহুদিদেরকে এখানে দণ্ডমুণ্ডের কর্তা বানিয়ে দিল? 


ধর্মের ভিত্তিতেই যদি ভূখণ্ডের দাবি আসে তাহলে আজকের ইসরাইল রাষ্ট্রকে তিন ধর্মের অনুসারীর সংখ্যানুপাতে তিন ভাগে ভাগ করে দিতে হবে। যেহেতু তিন ধর্মের অনুসারীদেরই সমান দাবি আছে এই অঞ্চলের ওপর সেহেতু সবার মাঝেই তা লোকসংখ্যা অনুযায়ী ভাগ করে দেওয়াটাই শুদ্ধতম এবং বিবেকঋদ্ধ কাজ। দুইশো বিশ কোটি (২.২ বিলিয়ন) খ্রিষ্টান অনুসারীর সংখ্যানুপাতে পুরো ফিলিস্তিন ভাগ করা হোক। একশো ষাট কোটি (১.৬ বিলিয়ন) মুসলমানের সংখ্যানুপাতে তাদের দেওয়া হোক নির্দিষ্ট ভূমি। আর এক কোটি চল্লিশ লাখ (১০.৪ মিলিয়ন) ইহুদির ভাগ্যে যতটুকু ভূমি বরাদ্দ হবে ঠিক ততটুকু নিয়েই তারা তাদের সাধের ইসরাইল আবাদ করুক। চাঁদির তালুতে টুপি পরে তেল আবিবে আরামছে বসে তাদের ধর্মীয় গ্রন্থ তালমুদ পাঠ করতে থাকুক। শুদ্ধতম বিচার কি এটাই নয়?


এখানে তাদের নবি জন্মেছিলেন বলেই এ ভূমি তাদের হয়ে যাবে, এই সংবিধান পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্র গ্রহণ করবে? কোনো সভ্য মানুষ এমন অনর্থক বাগড়ম্বর মেনে নেবে? পশ্চিমারা ধর্মের দোহাই দিয়ে একটা ফ্রাঙ্কেনস্টাইন দৈত্য বসিয়ে দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে। তাদের না আছে ধর্মভীতি আর না আছে নবিপ্রেম। যখন তখন গুলি করে, বুলডোজার চালিয়ে, বোমা মেরে মানুষ হত্যা করে তারা ধার্মিকতার দোহাই দিচ্ছে। পশ্চিমারা ধর্মের বড় সমঝদার হয়ে গেছে আজকাল। ‘ধর্মের কাণ্ডারি’ ইহুদিদের বন্দরে পশ্চিম থেকে প্রতিদিন আসছে গোলা-বারুদ, ট্যাংক-বিমান, মারণাস্ত্র। সেগুলো দিয়ে ধর্মের বরপুত্ররা মানুষের রক্তের ধর্মাচার শুরু করেছে। এটাই তো পশ্চিম আমাদের শিক্ষা দিচ্ছে। তারাই ধর্মের শান্তির কথা বলে আবার তারাই মারণাস্ত্র পাঠায় মানুষ মারতে, এর চেয়ে বড় অসভ্যতা আর কবে জন্মেছিল পৃথিবীতে!


আজকে বিশ্ববাসীর ব্যর্থতা যে, কিছু অসভ্য বর্বর লোকের কাছ থেকে তাদের সভ্যতা শিখতে হয়।




৩৩০ বার পঠিত

লেখক পরিচিতি

সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর -এর পাঠাগ্রহ মূলত ইতিহাস। ইতিহাসের রাজপথ যেমন, তেমনি অসংখ্য গলি-ঘুঁপচি চষে বেড়াতে ভালোবাসেন। তুলে আনতে চেষ্টা করেন ইতিহাসের আড়ালে চাপা পড়ে যাওয়া অন্য অনেক ইতিহাসকে। আন্তর্জাতিক ধর্মদর্শন, লৌকিক-অলৌকিক ধর্ম এবং ধর্মতত্ত্ব বিষয়েও তাঁর আগ্রহ প্রবল। ঐশ্বরিক যে কোনো জ্ঞান এবং মানবিক বিজ্ঞান তাঁকে আলোড়িত করে। পাঠাগ্রহের কারণেই তিনি লিখেন মূলত ইতিহাস এবং ধর্মদর্শনের মিশেলে। প্রথাগত ধর্মীয় আবহের বাইরে গিয়ে নির্মাণ করার চেষ্টা করছেন নতুন এক ভাষাভঙ্গি। সাবলীল, প্রাঞ্জল আর সাহসী গদ্য দিয়ে তিনি আমাদের চেনা চিত্রকে দৃশ্যমান করেন নতুন এক উপাখ্যানের আদলে। এটাই তাঁর বিশেষত্ব। জামেয়া কোরআনিয়া আরাবিয়া...

মন্তব্য

কোন মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

এ রকম আরও কিছু লিখা

এই সাইটের বেটা টেস্টিং চলছে...