সুফিয়ান সাওরি : উম্মাহর ইমাম

আব্বাসি খলিফা মাহদি খিলাফত লাভের পর সুফিয়ান সাওরি রহ.-কে রাজদরবারে তলব করেন। অনোন্যোপায় হয়ে সুফিয়ান সাওরি দরবারে উপস্থিত হন। মাহদি নিজের হাতে পরিহিত খিলাফতের মোহরাঙ্কিত আংটিটি খুলে সুফিয়ান সাওরির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলেন, হে আবু আব্দুল্লাহ! এটি আমার ব্যবহৃত আংটি। আপনার কাছে এটা অর্পণ করলাম। আপনি উম্মাহর মাঝে কুরআন ও সুন্নাহভিত্তিক বিচারকার্য পরিচালনা করুন। সুফিয়ান সাওরি আংটিটি হাতে নিয়ে বলেন, ‘আমিরুল মুমিনীন! আমি কিছু বলতে চাই!’

: বলুন!

: স্বাধীনভাবে বলার অনুমতি চাই। আমিরুল মুমিনীনের অভিপ্রায়ের বিরুদ্ধে কিছু বলে ফেললে পাকড়াও না করার নিশ্চয়তা চাই।

: নিঃসঙ্কোচে বলুন!

: আমাকে তলব করে কাউকে পাঠাবেন না, প্রয়োজন হলে আমি নিজেই চলে আসব। আমি কিছু না চাওয়া পর্যন্ত কিছু দেবেন না।


তাঁর এমন ভয়ডরহীন কথা শুনে খলিফা রেগেমেগে আগুন। তার চোখ ঠিকরে যেন আগুনের ফুলকি বের হচ্ছে। খলিফার এ অবস্থা দেখে তাঁর ফরমান লেখক খারাপ কিছু ঘটার আগেই কানে কানে বলেন, আপনি কী তাকে নিরাপত্তা দেননি?

: হ্যাঁ, দিয়েছি।


সুফিয়ান সাওরি আর কথা না বাড়িয়ে দরবার থেকে বেরিয়ে পড়েন। বাইরে আসতেই উপস্থিত আলিম ও জ্ঞানীগুণীজন তাকে ঘিরে ধরেন। সবার একটাই কথা, এ প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়ার যৌক্তিকতা কী? খলিফা তো আপনাকে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব দিতে চেয়েছেন?! বস্তুত তাঁর এই অনীহার কারণ ছিল, তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছেন, শাসকদের এসব আশ্বাস ফাঁকা বুলি ছাড়া বেশি কিছু নয়। বাস্তবতা ভিন্ন।


প্রিয় পাঠক, এ হচ্ছেন, আমিরুল মুমিনিন ফিল হাদিস ইমাম সুফিয়ান সাওরি। পুরো নাম, সুফিয়ান ইবনু সাঈদ ইবনু মাসরুক ইবনু হাবিব সাওরি রহ.। তবে আবু আব্দুল্লাহ উপনামেই লোকেরা তাকে সম্বোধন করত। সাওর গোত্রের বিধায় তাকে সাওরি বলা হয়। ক্ষণজন্মা এ মহান মনীষীর জন্ম ৯৭ হিজরি সনে। বনু উমাইয়ার খলিফা সুলাইমান ইবনু আব্দুল মালিক তখন খিলাফাহর সিংহাসনে সমাসীন হয়েছেন বছর পেরিয়েছে। এরপর একে একে সাতজন উমাইয়া খলিফা পরবর্তীতে তিনজন আব্বাসি খলিফার শাসনকাল তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন।


দ্বিতীয় শতাব্দীর প্রথম অর্ধেকে মুসলিম শাসকশ্রেণি ও জনসাধারণ, আম-খাস সবার কাছে সুফিয়ান সাওরি ছিলেন পরিচিত ও স্পষ্টবাদী ব্যক্তিত্ব। ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক, ইমাম আওজায়ি রহ.-এর সমসাময়িক ব্যক্তি তিনি। ইলম ও অবদানেও তাদের সঙ্গে কোনো দ্বিধা ছাড়াই তাঁর তুলনা করা যায়। এমনকি স্বতন্ত্র মাজহাবও ছিল তাঁর। ফুজাইল ইবনু ইয়াজের মতো মহান ব্যক্তি তাঁর অনুসারী হিসেবে গর্ব করতেন। ইলমের নগরী কুফায় তাঁর বসবাস ছিল। ইবনু আব্বাস রাদি.-এর ছাত্রদের কাছ থেকে ইলম অর্জনের সৌভাগ্য লাভ করেছেন। সুফিয়ান সাওরি ‘তাবে তাবেয়িন’ ছিলেন। আর এই যুগটা ছিল রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিস চর্চার স্বর্ণযুগ।


সুফিয়ান সাওরি প্রবাদতুল্য মেধা ও ধীশক্তিসম্পন্ন ছিলেন। হাফেজ জাহাবি রহ. বলেন,

সুফিয়ান সাওরি প্রখর ধীশক্তির কারণে ছোটকাল থেকেই প্রসিদ্ধি লাভ করেন। তরুণ বয়সেই তিনি হাদিসের দরস প্রদান শুরু করেন।


নিজের সম্পর্কে সুফিয়ান সাওরির বক্তব্য,

আমি আমার অন্তরে কোনো কিছু আমানত রেখেছি আর সে তার খিয়ানত করেছে (ভুলে গেছে) এমনটি হয়নি।


আব্দুর রহমান বিন মাহদি বলেন,

আমি তাঁর চেয়ে বেশি হাদিসের হাফিজ কাউকে দেখিনি।


সুফিয়ান সাওরি নিজেই বলেন,

আমার কান যা শ্রবণ করেছে, তার কোনো কিছু ভুলেনি।



উস্তাদগণ

বলা হয়, তিনি সাতশো শাইখের শিষ্যত্ব লাভ করেছেন। তম্মধ্যে তাঁর বাবা সাইদ, ইবরাহিম ইবনু আব্দুল আলা, ইবরাহিম ইবনু উকবা, আসওয়াদ ইবনু কাইস, আইয়ুব সাখতিয়ানি রহ. সবিশেষ উল্লেখযোগ্য



শিষ্যগণ যখন যুগের ইমাম

ইবনুল জাওজি রহ. বলেন,

সুফিয়ান সাওরি থেকে হাদিস বর্ণনাকারীর সংখ্যা ২০ হাজারেরও বেশি। এদের মধ্যে সর্বেসর্বা ছিলেন, আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক, ইয়াহইয়া ইবনু সাইদ, ওয়াকি, আব্দুর রহমান ইবনু মাহদি রহ. প্রমুখ।



হাদিসশাস্ত্রের মুকুটহীন সম্রাট

হাদিসের প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল অতুলনীয়। যেন তাঁর জন্মই হয়েছে হাদিস চর্চার জন্য। শুবা, সুফিয়ান ইবনু উয়াইনা, আবু আসিম, ইয়াহইয়া ইবনু মাইন প্রমুখ হাদিসশাস্ত্রবিদের মতে, সুফিয়ান সাওরি রহ. ছিলেন হাদিস শাস্ত্রে আমিরুল মুমিনিন। মুকুটহীন সম্রাট।


ইয়াহইয়া আল কাত্তান বলেন,

সুফিয়ান সাওরির হাদিসের প্রতি প্রবল আকর্ষণ ছিল। হাদিসের প্রতি তাঁর এতবেশি আকর্ষণের কারণে তাঁর ব্যাপারে আমার ভয় হতো। সাধারণত তিনি অবসর সময় নফল ইবাদতে কাটাতেন যদি না হাদিসের পঠন-পাঠনের কোনো ক্ষেত্র প্রস্তুত থাকত। এটা পেলে সবকিছু ছেড়ে হাদিসের মনি-মুক্তো আহরণে ডুবে যেতেন। হাদিসশাস্ত্রে তাঁর এই পাণ্ডিত্যের কারণে লোকেরা তাকে আমিরুল মুমিনিন ফিল হাদিস উপাধিতে ভূষিত করে।


আলি ইবনুল মাদিনি বলেন,

হাদিসের সনদগুলো ছয় ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় : ইমাম জুহরি, আমর ইবনু দিনার, কাতাদা, ইয়াহইয়া ইবনু আবি কাছির, আবু ইসহাক ও আমাশ। এরপর এই ছয়জনের ইলমের প্রতিনিধিত্ব করেছেন কুফার সুফিয়ান সাওরি।


আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহ. বলেন,

আমি সুফিয়ান সাওরির দরসে বসি। তিনি এত পরিমাণে হাদিস বর্ণনা করেন যে, আমার মনে হতে থাকে তাঁর যত হাদিস মুখস্ত ছিল সবই বোধহয় আমি শুনে নিয়েছি। এরপর অন্য সময় আবার যখন তাঁর দরসে বসি আর তিনি হাদিস বর্ণনা শুরু করেন, তো মনে হয়, আরে, আমি তো তাঁর ইলমের কিছুই শুনিনি।



ইসনাদ তথা বর্ণনাসূত্র দীনের অন্তর্ভুক্ত

হাদিসে রাসুল শরিয়ার দ্বিতীয় উৎসমূল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সাহাবা তাদের থেকে পরবর্তীগণ সহিহ ও বিশুদ্ধ সূত্রে এই হাদিস বর্ণনা করেছেন। মুহাদ্দিসগণ হাদিস গ্রহণের জন্য কঠোর শুদ্ধাশুদ্ধি নীতি অবলম্বন করতেন।


সনদ সম্পর্কে সুফিয়ান সাওরি বলেন,

ইসনাদ হল মুমিনের অস্ত্র। সুতরাং যার কাছে অস্ত্র নেই সে কী করে লড়াই করবে!

তিনি আরও বলেন,

তোমরা অধিক পরিমাণে হাদিস মুখস্ত করো, কারণ এটি মুমিনের অস্ত্র।


মুহাদ্দিসগণকে তিনি জমিনের পাহারাদার বলেছেন আর হাদিস অন্বেষণকে তিনি সবচেয়ে উত্তমকাজ হিসেবে গণ্য করেছেনবরেণ্যদের স্বীকৃতি


আব্দুর রহমান ইবনু মাহদি বলেন,

কখনো আমরা সুফিয়ান সাওরির কাছে বসে থাকতাম দীর্ঘ সময়। কিছু জিজ্ঞেস করার সাহসটুকু আমাদের হতো না। কারণ তাকে দেখে তখন মনে হতো যেন হাশরের মাঠে হিসেবের জন্য তিনি অস্থির হয়ে অপেক্ষা করছেন। তবে আমরা যখন হাদিসের আলোচনার প্রস্তাব দিতাম, তখন সেই অবস্থা কেটে যেত। আর নীরবতা কাটিয়ে তিনি ‘হাদ্দাসানা’-র পবিত্র আওয়াজে পরিবেশ প্রাণবন্ত করে তুলতেন।


উবাইদুল্লাহ ইবনু আব্দুর রহমান আল আশজায়ী বলেন,

আমি সুফিয়ান সাওরির কাছ থেকে সনদসহ ৩০ হাজার হাদিস শুনেছি।


সুফিয়ান ইবনু উয়াইনা বলেন,

নিজ নিজ যুগে হাদিসের বিশেষজ্ঞ ছিলেন তিনজন : আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাদি., ইমাম শাবি ও সুফিয়ান সাওরি।


ইবনুল মুবারক বলেন,

আমি এক হাজার একশত শাইখের কাছে ইলম শিখেছি। তম্মধ্যে সুফিয়ান সাওরি সবচেয়ে উত্তম ছিলেন।

ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহ. বলেন,

ইমাম হলেন সুফিয়ান সাওরি। আমার কাছে তাঁর থেকে অধিক মর্যাদা আর কারও নেই।


ইলমে হাদিস ছাড়া ইলমুল কুরআনেও তাঁর পাণ্ডিত্য ছিল। সুফিয়ান সাওরি রহ. নিজেই বলতেন, আমাকে ইলমুল কুরআন ও মানাসিক সম্পর্কেও জিজ্ঞেস করো। আমি



ফিকহের ইমাম

আব্দুল্লাহ ইবনু দাউদ বলেন,

আমি সুফিয়ান সাওরি থেকে বড় কোনো ফকিহ দেখিনি।


সুফিয়ান ইবনু উয়াইনা রহ. বলেন,

হালাল-হারাম সম্পর্কে সুফিয়ান সাওরির চেয়ে অধিক জ্ঞাত কাউকে দেখিনি।


ইবনুল মুবারক রহ. বলেন,

আমি সুফিয়ান সাওরির চেয়ে বড় বিদ্বান দ্বিতীয়জন দেখিনি।



সুফিয়ান সাওরি একজন আবিদ

আব্দুল্লাহ বিন ওয়াহাব বলেন,

আমি সুফিয়ান সাওরিকে মক্কা মুকাররামায় মাগরিবের পর নামাজরত অবস্থায় দেখেছি। একসময় তিনি সিজদায় যান। এবং ইশার আজান পর্যন্ত সিজদা থেকে আর মাথা তুলেননি।


ইয়াহইয়া ইবনু ইয়ামান বলেন,

সুফিয়ান সাওরিকে রাতের আঁধারে দেখেছি, তিনি বাইরে অস্থিরচিত্তে পায়চারি করছেন আর ঘুম তাড়ানোর জন্য চোখে পানি ছিটাচ্ছেন।


মুহাম্মদ বিন ইউসুফ বলেন,

সুফিয়ান সাওরি শেষরাতে আমাদের ঘুম থেকে জাগিয়ে দিতেন আর বলতেন, ওহে যুবকরা ওঠো! যৌবনকালটা এভাবে ঘুমিয়ে কাটিয়ো না, মহান প্রতিপালকের সম্মুখে সিজদারত হও।


আব্দুর রহমান বিন মাহদি বলেন,

সুফিয়ান সাওরি সালাতে দাঁড়িয়ে এতবেশি কাঁদতেন যে, কান্নার কারণে কী তেলাওয়াত করতেন তা বোঝা যেত না।


ইবনে আবি জিব বলেন,

ইবাদত, জুহদ ও তাকওয়ায় সুফিয়ান সাওরি তাবেয়িদের যোগ্য উত্তরসূরী।



তাকওয়া

সুফিয়ান সাওরি রহ. তাকওয়ার পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন,

হারাম থেকে বেঁচে থাকার নাম তাকওয়া নয়, তাকওয়া হচ্ছে সংশয়পূর্ণ বিষয় পরিত্যাগ করার নাম।


কুতাইবা ইবনু সাইদ বলেন,

সুফিয়ান সাওরি না থাকলে তাকওয়া বিষয়টিই বিস্মৃত হয়ে যেত।


আরও আজব ঘটনা শুনুন, আবু শিহাব বলেন, আমি সুফিয়ান সাওরির সাথে একরাতে শহরের পথ ধরে হাঁটছিলাম। দূর থেকে আলো ভেসে আসতে দেখে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এটা কোত্থেকে আসছে? আমি বললাম, এক পুলিশ কর্মকর্তার বাড়ি থেকে। তিনি বললেন, অন্যপথে চলো। তাদের বাতির আলোতে পথ চলতে চাই না। এ ছিল তাঁর তাকাওয়া।



জুহদ সম্পর্কে তাঁর ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান

সুফিয়ান সাওরিকে জিজ্ঞেস করা হলো, সম্পদশালী ব্যক্তি কী জাহিদ (দুনিয়াবিরাগী) হতে পারে? তিনি বললেন, অবশ্যই পারে। যদি সে বিপদাক্রান্ত হলে ধৈর্যধারণ আর সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে থাকলে কৃতজ্ঞতা আদায় করতে পারে।


তিনি আরও বলেন, শুকনো রুটি আর মোটা কাপড়ে জীবনধারণের নাম দুনিয়াবিমুখতা নয়, প্রকৃত দুনিয়াবিমুখতা আশা-আকাঙ্ক্ষা কমানোর নাম।


একব্যক্তি তাকে উদ্দেশ্যে বলল, শাইখ, আমাকে কিছু উপদেশ দিন! প্রতিউত্তরে তিনি বললেন, দুনিয়ার জন্য ততটুকু শ্রম দেবে, যতদিন এখানে তুমি বেঁচে থাকতে পারবে। আর পরকালের জন্য ততটুকু পরিশ্রম করবে, যতদিন সেখানে তুমি থাকবে। মনে রাখবে, পরকালের ভাবনা অর্জন করতে হলে দুনিয়ার ভালোবাসা পরিত্যাগ করতে হবে। যে ব্যক্তি দুনিয়ার প্রতি আসক্ত, পরকালের চিন্তা তার অন্তর থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়।



হালাল সম্পদ মুমিনের ঢালস্বরূপ

সুফিয়ান সাওরি বলেন,

আগেকার দিনে সম্পদ আহরণের প্রতি অনুৎসাহিত করা হতো। তবে বর্তমানের অবস্থা ভিন্ন। এখন প্রয়োজন পরিমাণ সম্পদ মুমিনের জন্য ঢালস্বরূপ।



পরকালের ভাবনা

সুফিয়ান সাওরি পরকালের ব্যাপারে এত বেশি ভাবতেন যে, কখনো কখনো তাকে দেখলে পাগল মনে হতো।



সুফিয়ান সাওরির কিছু উপদেশ

তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, সবচয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তি কে? উত্তরে তিনি বললেন, আলিমরা—যখন তারা বিপথগামী হয়ে যায়। তারপর জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, সবচেয়ে নিকৃষ্ট আকাঙ্ক্ষা কী? উত্তরে তিনি বললেন, আখিরাতের আমলের মাধ্যমে পার্থিব জীবনের সুখ-শান্তি অন্বেষণ করা।


তিনি আরও বলেন, মন্দ কাজ হচ্ছে রোগের মতো। আর এর চিকৎসক হচ্ছেন—আলিমগণ। সুতরাং আলিমগণ পথভ্রষ্ট হলে চিকিৎসা কে করবে?


শাসকের দরবারে আশ্রিত ফকিহ সম্পর্কে তিনি বলেন, যখন দেখবে কোনো ফকিহ শাসকের আশ্রয়ে জীবন কাটায়, তো ধরে নেবে সে চোর।


জালিমের জন্য দুআ করা প্রসঙ তিনি বলেন, জালিমের চেহারার দিকে তাকানোও পাপ। দুআ তো পরের কথা!


হালাল উপার্জন করার প্রতি উৎসাহিত করে তিনি বলেন, তোমার উপার্জন যেন তোমার পক্ষে যায়, বিপক্ষে না যায়।


একব্যক্তি সুফিয়ান সাওরির হাতে দিনার দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, আবু আব্দুল্লাহ, আপনিও দুনিয়ার পেছনে ছুটতে শুরু করেছেন? সুফিয়ান সাওরি রেগে বললেন, চুপ করো! বেকুব কোথাকার! এগুলো না থাকলে শাসকরা আমাদের হাতের পুতুল বানিয়ে রাখত।



বিচারক হওয়ার প্রস্তাব পাশ কাটানোর আজব কৌশল

রাবী বিন সুলাইমান বলেন, আমি ইমাম শাফেয়ি রহ. কে বলতে শুনেছি,

একবার সুফিয়ান সাওরিক রাজদরবারে তলব করা হয় বিচারক বানানোর জন্য। তিনি এ পদ গ্রহণ করবেন না কিছুতেই। তবে খলিফার নির্দেশ সরাসরি প্রত্যাখ্যানও করতে পারছিলেন না তার রোষানলে পড়ার ভয়ে। তখন রাজদরবারে ঢুকেই তিনি পাগলামি শুরু করেন। দরবারের দামি মখমলের কার্পেটগুলো ছুঁয়ে বলতে থাকেন, আরে বাহ, কত সুন্দর! কত দামে কিনেছেন এগুলো? তাঁর এমন অযাচিত আচরণ দেখে দরবারের লোকেরা তাকে পাগল মনে করে এবং বের করে দেয়। পরে যখন জানতে পারে এসব তাঁর ভনিতা ছিল, তখন পাইক-পেয়াদা পাঠিয়ে তাকে বন্দী করার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে এ সংবাদ সুফিয়ান সাওরির কাছে পৌঁছে যায়। সে থেকে ১০ বছর পর্যন্ত তিনি আত্মগোপনে থাকেন। একান্ত পরিচিত ও আস্থাভাজন ছাড়া কারো সামনে আসতেন না। পরবর্তীতে ১৫৫ হিজরিতে তিনি নিজের জন্মভূমি কুফা ছেড়ে মক্কায় হিজরত করেন



আমির-উমারার হাদিয়া

সুফিয়ান ইবনু উয়াইনা বলেন,

মুহাম্মাদ বিন ইবরাহিম হাশেমি তখন মক্কার গভর্নর। একবার তিনি সুফিয়ান সাওরির জন্য হাদিয়া হিসেবে দুইশত দিনার পাঠান। সুফিয়ান সাওরি তা ফিরিয়ে দেন। আমি তাকে জিজ্ঞেস করি, শাইখ, এটা কি হলাল নয়? বললেন, হ্যাঁ, হালাল। তবে আমি এতে লাঞ্ছনা আর বিপদ দেখছি। কারণ এ হাদিয়া গ্রহণ করার পর আমিরের বিরুদ্ধে কিছু বলতে মন সায় দেবে না। সম্পদ বড় জাদুকরী জিনিস।



রিবাতের ময়দানে

মুসলিমদ জনপদের সীমান্ত পাহারাদারি করার ফজিলত অনেক। হাদিসের ভাষায় একে রিবাত বলে। জিহাদ ও ইবাদতও বলা হয়েছে। তাই বড় বড় ইমামগণ এ ফজিলত লাভে সচেষ্ট ছিলেন। ইমাম শাফেয়ি ইস্কান্দারিয়ার সীমান্তে পাহারাদারি করেছেন। ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল তারসুস নগরীর সীমান্তে পাহারাদারি করেছেন। ইমাম ইবনুল মুবারকও পাহারাদারি করতেন।


ফিরইয়াবি বলেন,

সুফিয়ান সাওরি বাইতুল মুকাদ্দাসের আসকালান নগরীতে ৪০ দিন সীমান্ত পাহারা দিয়েছেন।



তাঁর রচনাবলি

সে যুগে রচনার প্রচলন ছিল কম। মুখস্ত বিদ্যার যুগ ছিল সেটা। তবে যাঁরা লিখতেন, সুফিয়ান সাওরি তাদের অন্যতম ছিলেন। তাঁর কিছু রচনা-সংকলন হচ্ছে,

  • আল জামিয়ুল কাবির ফিল হাদিস
  • আল জামিয়ুস সগির
  • কিতাবুল ফারাইজ
  • রিসালাতুন ইলাল আব্বাদ বিন আব্বাদ আল আরসুকি প্রভৃতি



খলিফা ও আমিরদের সঙ্গে আচরণ

আব্বাসি খিলাফতের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী খলিফা হারুনুর রশিদ খিলাফতের মসনদে আসীন হয়েছেন খুব বেশি সময় হয়নি। খিলাফত লাভের পর থেকে বিভিন্ন ঘরানার বিশিষ্ট আলিমগণ খলিফার দরবারে এসে তার প্রশংসা করেন এবং শুভকামনা জানান। তবে এত লোকের ভিড়ে খলিফার উৎসুক মন কার যেন অপেক্ষায় ছিল। আশ্চর্য! এত এত বিদ্বান-পণ্ডিতরা রাজদরবারে আসছেন, তিনি কেন এখনও আসছেন না?! শেষপর্যন্ত খলিফা নিজেই তাঁর কাছে পত্র লেখেন। যার ভাষ্য ছিল,


বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। আল্লাহর বান্দা হারুনুর রশিদের পক্ষ থেকে তার দীনি ভাইয়ের প্রতি...প্রিয় ভাই, আল্লাহ তাআলা মুমিনদেরকে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করেছেন। সে সূত্রে আমিও আপনাকে ভ্রাতৃত্বের সুতোয় আবদ্ধ করেছি। আপনার জন্য ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের সদিচ্ছা পোষণ করছি। যদি না এ খিলাফাহর দায়িত্ব অর্পিত হতো, তাহলে হাঁচড়ে-পাঁচড়ে হলেও আপনার সান্নিধ্য পেতে চলে আসতাম। আমার ও আপনার পরিচিত আলিমরা ইতোমধ্যে আমার সাক্ষাতে এসেছেন। শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন। আমিও উপহার ও দানের দুয়ার উন্মুক্ত করেছি তাদের জন্য। সানন্দে বেহিসেব দানে তাদের পরিতৃপ্ত করেছি। তবে আপনার দর্শনের অপেক্ষা যেন ফুরোচ্ছে না। এই চিঠি মূলত আপনার সাক্ষাতের আকুলতার বহিঃপ্রকাশ। আশা করি পত্র পৌঁছামাত্র আপনার শুভাগমন বিলম্বিত হবে না। আপনি জানেন, মুমিন ভাইয়ের সাথে দেখা-সাক্ষাতেও ফজিলত রয়েছে।


এরপর হারুনুর রশিদ পত্রটি আব্বাদ তালকানির মারফতে সুফিয়ান সাওরি রহ.-এর কাছে পাঠান। পরবর্তী বৃত্তান্ত আব্বাদের জবানিতেই শুনুন। আব্বাদ বলেন,

আমি চিঠিসহ কুফায় পৌঁছলাম। সুফিয়ান সাওরি যে মসজিদে অবস্থান করছেন, সেখানে। আমাকে দেখামাত্র তিনি ইসতেগফার পড়তে থাকেন। আর বিড়বিড় করে বলেন, হে আল্লাহ, মন্দ বার্তবাহী আগন্তুক থেকে পানাহ চাই। এরপর তিনি নামাজে দাঁড়িয়ে যান, অথচ সেটি কোন ফরজ নামাজের সময় ছিল না। আশ্চর্য ব্যাপার হচ্ছে, আমার দিকে না তিনি, না তাঁর মজলিসের অন্য কেউ একটিবার চোখ তুলে তাকায়। নামাজ শেষ হতেই আমি তাকে সালাম দিই। আমাকে কেউ বসতেও বলেনি। তাদের এ অবস্থা দেখে আমার মধ্যে কেমন যেন ভয় কাজ করতে শুরু করে। আমি পত্রটি তাঁর দিকে এগিয়ে দিই। এটা দেখেই তিনি যেন কেঁপে ওঠেন। মনে হয়, আমি যেন একটি সাপ তার হাতে দিচ্ছি। চিঠির দিকে না তাকিয়েই তিনি একজনের দিকে তা ছুঁড়ে মেরে বলেন, খুলে পড়তে। চিঠিটি পড়া শেষ হলে তিনি বলেন, এর উল্টো পিঠে আমার উত্তর লেখো। কেউ বলে ওঠে, শাইখ! এটা খলিফার চিঠি। যদি আলাদা সাদা পাতায় আপনার উত্তরপত্র লিখতেন! এ কথা বলতেই তিনি রেগে-মেগে বলেন, জালিমের কাছে এতেই লেখো। সে এ কাগজের মালিকানা হালালভাবে অর্জন করে থাকলে এর প্রতিদান পাবে, অন্যথায় তা তার জাহান্নামের ইন্ধন হবে। তো আমি জালিমের ব্যবহৃত কোন বস্তু রাখতে যাব কেন? নিজের দুনিয়া-আখিরাত বরবাদ করতে?


****


সুফিয়ান সাওরি তাওয়াফরত অবস্থায় ছিলেন। আচমকা কে যেন তাঁর কাধে আঘাত করে বলে ওঠে, আমাকে চেনেন?

: না, চিনি না। তবে আপনি আমাকে জালিমের মতো আঘাত করেছেন, এটুকু জানি।

: আমি খলিফাতুল মুসলিমিন আবু জাফর। আবু আব্দুল্লাহ! আমাকে উপদেশ দিন!

: আপনি যা জানেন, তা অনুযায়ী কতটুকু আমল করেছেন যে, আমি আপনাকে অজানা বিষয়ে নসিহত করব?

: তো আপনি আমার কাছে আসেন না কেন?

: আল্লাহ নিষেধ করেছেন। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন,

وَلاَ تَرْكَنُواْ إِلَى الَّذِينَ ظَلَمُواْ فَتَمَسَّكُمُ النَّارُ

আর পাপিষ্ঠদের প্রতি ঝুঁকবে না। নতুবা তোমাদেরও আগুনে জ্বলতে হবে। সুরা হুদ : ১১৩


এরপর খলিফা আবু জাফর তার সহচরদের দিকে ফিরে বলেন, আমরা আলিমদের প্রতি ভালোবাসার হাত প্রসারিত করেছি, তারাও তা সাদরে গ্রহণ করেছেন। তবে সুফিয়ান ব্যতিক্রম। তার নাগাল আমরা পাইনি।


আব্দুর রাজজাক বর্ণনা করেন, একবার আবু জাফর মানসুর সুফিয়ান সাওরির গায়ের চাদর ধরে তাকে কাবার দিকে ঘুরিয়ে বলেন, কাবার রবের শপথ দিয়ে জিজ্ঞেস করছি, আমাকে কেমন মনে হয় আপনার? সুফিয়ান সাওরি দীপ্তকণ্ঠে বলে ওঠেন, কাবার রবের শপথ, আপনি আমার দেখা নিকৃষ্ট লোক।


আবু জাফরের জুলুমের ব্যাপারে সুফিয়ান সাওরি সবসময় সোচ্চার ছিলেন। আবু জাফরের ওপর বিরক্ত হয়ে একবার আশপাশের লোকদের বলেন, আবু জাফর আমার কাছে কী চায়? আল্লাহর কসম, আমি তার সম্মুখে দণ্ডায়মান থাকলেও বলব, তুমি সিংহাসন ছেড়ে দাও। তোমার চেয়ে অন্যরা এর যোগ্য বেশি।


সুফিয়ান সাওরির ওপর খলিফা আবু জাফর মানসুর যারপরনাই রুষ্ট ছিল। একপর্যায়ে আবু জাফর জল্লাদদের নির্দেশ দেন, তাকে যেখানে পাবে ধরে এনে শূলে চড়িয়ে দেবে। জল্লাদরা ফাঁসির শূল স্থাপন করে সুফিয়ান সাওরির খোঁজে বেরিয়ে পড়ে। গিয়ে দেখে সুফিয়ান সাওরি আধশোয়া। তাঁর মাথা ফুজাইল ইবনু ইয়াজের কোলে আর পা দুখানা সুফিয়ান ইবনু উয়াইনার কোলে। রাজপেয়াদারা এই অবস্থা দেখে স্তম্ভিত হয়ে যায়। বিনয়াবনত হয়ে বলে, আবু আব্দুল্লাহ, আল্লাহকে ভয় করুন। শত্রুদের কাছে আমাদেরকে হাস্যরসের পাত্র বানাবেন না। খলিফার পক্ষ থেকে আপনার মৃত্যুর পরোয়ানা এসেছে। অথচ আপনি নির্বিকার। সুফিয়ান সাওরি রহ. তখন উঠে কাবার গিলাফ ধরে বলেন, আল্লাহর শপথ, আবু জাফর এখানে আসতে পারবে না। দেখা গেল, সত্যি সত্যিই আবু জাফর মক্কায় প্রবেশের পূর্বে আকস্মিক মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। আর এভাবেই আল্লাহ তাআলা সুফিয়ান সাওরির শপথ রক্ষা করেন।


শাসকদের দরবারে গমন ও তাদের তোষামোদ করাকে সুফিয়ান সাওরি রহ. মারাত্মক পদস্খলন মনে করতেন। পুরো জীবনে তিনি এ দরবারবিমুখতার নীতিতে অবিচল ছিলেন।



অন্তিম শয়ান

আবু উসামা বলেন,

সুফিয়ান সাওরি অসুস্থ হলে আমি তাঁর প্রস্রাব পরীক্ষা করার জন্য হেকিমের কাছে তা নিয়ে যাই। হেকিম জানান, এতো একজন আবিদের প্রস্রাব। অত্যাধিক চিন্তার কারণে তার কলিজা ফেটে গেছে।


আব্দুর রহমান বিন মাহদি বলেন,

সুফিয়ান সাওরি শাসকদের জুলুম থেকে বাঁচার জন্য জীবনের শেষ সময়ে এসে মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা করতেন। মুমূর্ষু অবস্থায় উপনীত হয়ে পড়লে অসুস্থতার কষ্ট লাঘবের জন্য একবার আমাকে সুরা ইয়াসিন পাঠ করতে বলেন। আমি সুরা শেষ করতেই তাঁর নিশ্বাস ভারী হয়ে আসে। আর তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করে আল্লাহ তাআলার ডাকে সাড়া দেন।


১৬১ হিজরির শাবান মাসে বসরা নগরীতে এ মহান ইমাম ইন্তেকাল করেন। আল্লাহ তাঁর কবরকে রহমতের বারিধারায় সিক্ত করুন।


.......


তথ্যসূত্র :

১.মিন জামহারাতি আনসাবিল আরাব লি ইবনে হাযাম
২.সিয়ারু আলামিন নুবালা
৩.তাহযিবুত তাহযিব
৪.হিলইয়াতুল আউলিয়া
৫.আল জারহু ওয়াত তাদীল
৬.তারিখে বাগদাদ
৭.আল ইবার
৮.ওয়াফায়াতুল আইয়ান
৯.তারিখু আবি যুরআ
১০.আল ফিহরিসত লি ইবনিন নাদিম
১১.তাবাকাতুল মুফাসসিরীন
১২.আল ইমামু সুফিয়ান সাওরি

৪৮৬ বার পঠিত

লেখক পরিচিতি

হাসান মাহমুদ। একাডেমিক পড়াশোনার শুরু কওমি মাদরাসায়। বর্তমানে হাদিসের খেদমতে আছি এক মাদরাসায়। অনুবাদ ও সম্পাদনার সাথে জড়িয়ে আছি যদিও; তবে গবেষণাধর্মী পড়াশোনা ও ইতিহাসপাঠ আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। ভাবি, স্বপ্ন বুনি কল্যাণ-শতাব্দীর সমাজব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার। ধ্যান-জ্ঞান জুড়ে থাকে ইসলামের বিজয়ের ভাবনা।

মন্তব্য

কোন মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

এ রকম আরও কিছু লিখা

এই সাইটের বেটা টেস্টিং চলছে...