ইমাম গাজালি : মুসলমানদের দর্শন ও বিজ্ঞানের সোনালি যুগের পতন

পূর্বকথা

অনুসন্ধানের প্রবণতা আমার মধ্যে সবসময় কাজ করে। সে-ই ধারাবাহিকতায় অনেক আগে একবার Wikisource এর উপর রিসার্চ করছিলাম, অনুসন্ধান চালাচ্ছিলাম। ইমাম গাজালিকে নিয়ে অনেক পুরাতন একটা বই পেলাম। বইয়ের মধ্যে এক জায়গায় এমন কিছু লেখা ছিল, He wrote a book named—Destruction of Science। তখন অবশ্য বেশি কিছু জানতাম না, তবে তাহাফুতুল ফালাসিফা-এর অর্থ Destruction of Science কীভাবে হয়, সেই ভাবনা জাগার জন্য বেশি কিছু জানা লাগে না। আরবি ভাষায় ‘ফালসাফা’ কখনো বিজ্ঞান বোঝানোর জন্য ব্যবহার হয়েছে বলে আমার জানা নেই। আর ফালাসিফা অর্থ দার্শনিকগণ, দর্শনও না। অনুবাদে বড়ধরনের ভুল হলেও সেটার রূপ দাঁড়াত—Destruction of Scientists। কিন্তু Science কীভাবে হয়? কি মনে হয়?


তাহাফুতুল ফালাসিফা-এর স্ট্যান্ডার্ড ইংরেজি অনুবাদ Incoherence of the Philosophers। আর এটাই সে-ই গ্রন্থ, যা রচনা করার কারণে ইমাম গাজালিকে মুসলিম বিশ্বে বিজ্ঞানের পতনের জন্য দায়ি করা হচ্ছে। আরেকটু স্পষ্ট করে বললে, এই দর্শনে ইসলাম ও মুসলমানদের স্বর্ণযুগের পতনের জন্য দায়ি করা হচ্ছে। বিস্তারিত আলোচনায় প্রবেশ করা আগে একটু কথা বলুন তো! আপনার কমনসেন্স কি এটা মেনে নেয় যে, শত শত মানুষের বিনিদ্র রজনীর পরিশ্রমে তৈরি হওয়া ‘গোল্ডেন এজ’ মাত্র একটা বইয়ের কারণে শেষ হয়ে যাবে? আপনার বিবেক মেনে নেয়?


যদিও পশ্চিমে আবু হামিদ আল-গাজালির দার্শনিক শ্রেষ্ঠত্ব ভালোভাবেই প্রতিষ্ঠিত, এমনকি অ্যাকাডিমিয়া (ওয়েবসাইট)-এ তার ফলোওয়ারের সংখ্যা তের হাজার, যা দর্শনের মুকুটহীন সম্রাট ইবনে সিনা থেকে তিন হাজার বেশি। তারপরও ‘ইমাম গাজালিকে দাঁড় করানো হচ্ছে, দর্শনে ইসলামের স্বর্ণযুগ শেষ হয়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে।’ ইসলামিক গোল্ডেন এজের সবচেয়ে ওয়াইডস্প্রেড মিথ। এ কথা আপনি বিখ্যাত ‘বিজ্ঞানমানব’ Neil DeGrasse Tyson, ফিজিক্সে নোবেল বিজয়ী Steven Weinberg-এর মুখেও শুনতে পাবেন। ২০০৭ সালে এ্যাওয়ার্ড উইনিং বিজ্ঞানের ঐতিহাসিক জর্জ স্যালিবা এই মিথকে উড়িয়ে দেওয়ার পর এখনও decline of science in Islam লিখে গুগলে সার্চ দিলে উপরের দিকেই ২০১৫ সালে প্রকাশিত ২০ পৃষ্ঠার মতো একটি (ছেঁড়াফাটা) আর্টিকেল পাবেন—যেটা দাবি করে, ইমাম গাজালির কারণে মুসলিমবিশ্বে দর্শন ও বিজ্ঞানের পতন হয়েছে। শুধু এটুকু দাবি করেই শেষ করেনি। সে-ই আর্টিকেলে পুরো ইসলামি ধর্মতত্ত্বকেও এর জন্য দায়ি করা হয়েছে।


যখন ইসলামিক গোল্ডেন প্রথম স্টাডি শুরু করি, একের পর এক বিপাকে পড়তে হয়। এত এত প্রবলেম! আর এগুলোর সমাধান বের করা গুগলে সার্চ করে বের করার মতো সহজও না। কথা হচ্ছে, এটা এমন একটা সাবজেক্ট, যা নিয়ে রিসার্চ করা মানুষের সংখ্যাও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। আবার যারা বড় স্কলার আছেন, তারাও কিছু লিখলে বেশি জটিল করে ফেলেন—সাধারণ পাঠকের পক্ষে বুঝে ওঠা কঠিন হয়ে যায়। অন্যদিকে জেনারাল পাঠকদের জন্য লেখা ১০ টা বই পড়লে সেখানে বিজ্ঞানের যে উৎকৃষ্টতার বর্ণনা পাবেন, সবগুলো বইয়ের মধ্যে আসলে প্রায় একই। ইসলামিবিজ্ঞানের ইতিহাস সবজায়গায় স্বল্পই গুরুত্ব পায়। আবার ফিলোসফি-কেন্দ্রিক প্রবলেমগুলোর সমাধান করা আরেক কঠিন কাজ। আমার এই লেখাটা তৈরি করার ক্ষেত্রেও বিজ্ঞানের পতন পর্যন্ত খুব তাড়াতাড়িই শেষ হয়ে যায়। কিন্তু দর্শনের ক্ষেত্রে এসে আরও সময় লাগে। ফলে লেখাটা পূর্ণতা পেতে বেশ সময় লেগে যায়। আবু হাইয়ান তাওহিদি (d. 1023) একটা কথা বলেছিলেন, Philosophy and theology breed nothing but confusion। তো পড়তে পড়তে দেখতে পেলাম, এত এত মিথ! মানুষের মুখে বিভিন্ন কথা ঘুরে ঘুরে এমন অবস্থা হয়েছে যে, মিথের বাস্তবতা-অবাস্তবতা নির্ণয় করাই মুশকিল হয়ে যায়। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, অসংখ্য গবেষণা-প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রকাশিত বই, রিসার্চ সেন্টার থেকে প্রকাশিত আর্টিকেলের মধ্যেও স্থান পেয়ে যায় রূপকথা সদৃশ এসব ভিত্তিহীন মিথ।


ইমাম গাজালি যে দর্শনবিরোধী ছিলেন না, সেটা বুঝতে জ্ঞানের অনেক গভীরতা লাগে না। প্রয়োজন হয় গভীর গবেষণাও। সামান্য পড়াশোনা করলেই বিষয়টা দিবালোকের মতো সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। কিন্তু ‘সামান্য’ সে-ই পড়াশোনার জন্য তো আলাদাভাবে সময় ব্যয় করতে হয়! বই আর রিসার্চ-পেপারে মাথা গোঁজতে হয়। এটা মনে হয়, অনেক ভারি হয়ে যায় বেশিরভাগ মানুষের জন্য।


কনফ্লিক্ট থিসিস

কনফ্লিক্ট থিসিস প্রমোট করতে সবাই অনেক মজা পায়। মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সবাই। এর বেসিস অবশ্য পশ্চিমাদের থেকে এসেছে। সেটা আবার লম্বা কাহিনি। ওরিয়েন্টালিস্টরা ওয়েস্টে খ্রিষ্টধর্ম ও বিজ্ঞানের সংঘাত কে মূল ধরে মুসলিম বিশ্বেও এমন খুঁজতে শুরু করে। ইউরোপেও অবশ্য ওয়েস্টের মানুষরা এমনই করেছে। যুক্তি আর অহির মাঝে একটা বিরোধ ইতিহাসে অনেক আগে থেকেই দেখা যায়। বিভিন্ন মানুষ এর উপর বিল্ড করে বিজ্ঞান আর ধর্মের মাঝেও চিরকালের একটা সংঘাত দেখাতে চেয়েছে। বিজ্ঞানের এক পজিটিভিস্ট ইতিহাস। দুঃখজনকভাবে বিজ্ঞানের ইতিহাসের জনক জর্জ সার্টনও একজন পজিটিভিস্ট ছিলেন। তিনি কনফ্লিক্ট থিসিস প্রোমোট করতেন। তার প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানের ইতিহাসের প্রথম ও সবচেয়ে সেরা রিসার্চ জার্নাল Isis শুরু থেকেই বিজ্ঞানের পজিটিভিস্ট ইতিহাস প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাচ্ছে। সার্টন এটা পর্যন্ত বলেছিলেন যে, The purpose of teaching history of science is to establish a ‘New Humanism (সহজ ভাষায় ধর্মহীনতা)। এখানে ছাঁচ কিন্তু আগে থেকেই তৈরি করা। আগের বিশ্বাস ঠিক রেখে তারা তথ্য খুঁজে। নাস্তিক ফিজিসিস্ট জিম আল-খালিলি অবাক হয়ে ইবনুল হায়সামের ব্যাপারে বলেন,

ইবনুল হায়সাম যে ধর্মপ্রাণ মুসলিম ছিলেন না সেটা বলার জন্য আমাদের কাছে কোন প্রমাণ নেই


অর্থাৎ ইবনু হাইসামের মধ্যে একজন মডার্ন ফিজিসিস্টের সব বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান আছে। তারপরও কীভাবে তিনি ধর্মপ্রাণ মুসলিম হতে পারেন—সেটা মেনে নিতে জিম আল-খালিলির অনেক কষ্ট হচ্ছে। কনফ্লিক্ট থিসিস প্রমোট করবেন, কারণ তিনি নিজে আগে থেকে এর দ্বারা প্রভাবিত। যেমনিভাবে অসংখ্য মুসলিম লেখকও এর দ্বারা প্রভাবিত। ফলে এখন যে ব্যক্তিই মুসলিম বিজ্ঞানীদের নিয়ে পড়তে যায়, ‘ধর্মহীনতা’ আর ‘ভ্রান্ত বিশ্বাস’ দেখতে পায়। শুরু থেকেই ওরিয়েন্টালিস্টরা দেখিয়ে আসছে—মুসলিম বিশ্বে যারা ধর্ম থেকে দূরে, তারাই বিজ্ঞানকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে। এটা প্রমাণ করার উদ্দেশ্যে একের পর এক হাস্যকর মিথের অবতারণা করা হয়েছে। এমনই একটা মিথ হচ্ছে এই দাবি—‘মুতাজিলাদেরকে উৎখাতের পর বিজ্ঞানযাত্রা শ্লথ হয়ে গেছে’। ওরিয়েন্টালিস্টরা দাবি করে, মুতাজিলাদের কারণেই নাকি বিজ্ঞান তার উন্নতি ও সমৃদ্ধির শীর্ষ চূড়ায় ছিল। অথচ মুতাজিলারা ক্ষমতায় ছিল মাত্র ৩৪ বছর। পাঠক, আপনিই বলুন, মাত্র ৩৪ বছর কী বিজ্ঞানের চরম উন্নতি ও সমৃদ্ধির জন্য যথেষ্ট? আপনার কমনসেন্স কি বলে?


আলী কুশজি, ১৫শ শতকের সেরা একজন অ্যাস্ট্রোনোমার, একজন আশআরি ধর্মতাত্ত্বিক ও আলিম ছিলেন। কিন্তু ওরিয়েন্টালিস্টরা সারাজীবন তাঁর মতো শত শত বিজ্ঞানীদের এড়িয়ে গিয়েছে। আর ইবনু সিনা, ইমাম রাজি ও উমার খাইয়াম প্রমুখ যাদের নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি করা যায়, তাদেরই প্রমোট করা হয়েছে সবসময়। বিষয়টা কি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মনে হয় না? একটু ভেবে দেখুন তো!


বিজ্ঞানের পতন

অ্যাকাডিমিয়ায় কনফ্লিক্ট থিসিসের ধারণার সূত্রপাত হয় ইগনাজ গোল্ডজিয়ার (d. 1921) থেকে। তবে মুসলিমবিশ্বে এর মূল নায়ক বলা যায়—পারভেজ হুদভয়-কে। পারভেজ হুদভয়ের থিসিস পুরোই ভিত্তিহীন। হিস্টোরিক্যাল দিকগুলোর ক্ষেত্রে প্রমাণ বলতে কিছু নেই। দাবিগুলো চেরি পিকিং ফ্যালাসিতে ভরা। পপ্যুলার বিলিফকে কিছুটা সাহিত্যের রূপ দিয়ে উপস্থাপন করেছে। লেখায় কিছুটা অভিনবত্ব আনার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সেটা কোনো মৌলিক কাজ ছিল না। উপরের নিল টাইসন আর স্টিভেন ওয়াইনবার্গের মতো তিনিও বিজ্ঞানের মানুষ, বিজ্ঞানের ইতিহাসে কোনো ট্রেনিং নেই। আরেকটু সরলভাবে বললে বলতে হয়, হুদভয়ের অবস্থা এতটাই খারাপ, তার জ্ঞান এতই অসমৃদ্ধ যে, তিনি ইমাম গাজালিকে ‘আরব’ বলে অভিহিত করেছেন। অথচ ইমাম গাজালি ছিলেন পারস্যের। সামান্য এই তথ্যটুকু না জানাটা খুবই লজ্জাজনক। পাঠক, এবার আপনিই বিচার করুন—তার পুরো গবেষণার এবার কি অবস্থা হয়েছে! আসাদুল্লাহ আলি (গাজালির ক্ষেত্রে) তার এই থিসিসকে পুরোপুরি ধুয়ে দিয়েছেন।


ইমাম গাজালি, গ্রিক-বিজ্ঞানের বিরুদ্ধবাদী ছিলেন। গ্রিকদের বিভিন্ন দুর্বল পজিশন থেকে মুসলিমদের তিনি বিমুক্ত করেন। আর ইসলামি বিজ্ঞান ও ইসলামি দর্শনের ভিত মজবুত করেন। এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, ইমাম গাজালি কিন্তু বিজ্ঞান-বিরোধী ছিলেন না—ছিলেন গ্রিক-বিজ্ঞানের বিরোধী। রবার্ট উইস্নভস্কি বলেন, বেশিরভাগ স্কলার এখন একমত যে, গাজালির কারণে মুসলিমবিশ্বে দর্শন ও বিজ্ঞানের পতন হয় দাবি করাটা একেবারেই ভিত্তিহীন। বিখ্যাত গাজালি স্কলার ফ্র্যাংক গ্রিফেল বলেন,

আগের ঐতিহাসিকরা বলেছিলেন যে, ইসলামের দার্শনিক ট্রেডিশান ধ্বংস করার জন্য গাজালি দায়ি। তবে আজ আমরা জানি—এটা সত্য নয়।

প্রফেসর জন ওয়ালব্রিজ বলেন,

ইসলামি দর্শনের সবচেয়ে অরিজিনাল পিরিয়ড শুরু হয় ইমাম গাজালির ঠিক পর পর।

বিজ্ঞানের ঐতিহাসিক অরুন বালা বলেন,

ইমাম গাজালির রচনাসমগ্র গ্রিকদের অন্ধ অনুসরণের শিকল থেকে মুসলিম বিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের বেরিয়ে আসতে সহায়তা করে। তিনি এ-ও বলেছেন যে, ইমাম গাজালির রচনার কারণে পশ্চিমেও অন্ধবিশ্বাস চর্চা বন্ধ করে মানুষ চিন্তা করতে শেখে।


তার মতে, modern empirical science আসলে গড়ে উঠেছে ইমাম গাজালির আইডিয়াগুলোর উপর ভিত্তি করে। কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির প্রফেসর জর্জ স্যালিবা বলেছেন, ইমাম গাজালির পর ইসলামি জ্যোতির্বিদ্যার আসল সোনালি যুগ শুরু হয়। আসলে ইমাম গাজালির রচনা মুসলিমবিশ্বে the age of fecundity for science আনার জন্য পজিটিভ প্রভাব ফেলে। এদের কথা মুসলিমবিশ্বে বিজ্ঞানের পতনের সঙ্গে ইমাম গাজালির কোনো সম্পর্কই নেই—বরং দ্বিধাহীন চিত্তে স্বীকার করে নিতে হয় যে, পারতপক্ষে তার কারণেই মুসলিমবিশ্বে বিজ্ঞানের উন্নতি ও অগ্রগতি হয়। এমনকি তার চিন্তাধারা জেনারালি সমগ্র বিশ্বে বিজ্ঞানের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এখানে একটা ইন্টারেস্টিং বিষয় হচ্ছে, পশ্চিমে আধুনিক দর্শনের অগ্রদূত যাকে ধরা হয়, সে-ই রেনে দেকার্ত অ্যারিস্টটলিয়ান ফিলোসফির অনেক কিছুই রিজেক্ট করেন। অথচ একই কাজ যখন তারও ৬০০ বছর আগে ইমাম গাজালি করেছিলেন। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, এই গাজালিকেই কিনা বলা হচ্ছে—বিজ্ঞান ও দর্শনের খুনি।


গাজালি বলেছেন,

A grievous crime indeed against religion has been committed by the man who imagines that Islam is defended by the denial of the mathematical sciences


তিনি প্রকৃতি সম্পর্কিত বিজ্ঞান (যাকে আমরা ফিজিক্স বলি) এর ক্ষেত্রে দার্শনিকদের পন্থা অনুসরণ করতে বলেন আর ধর্মীয় গোঁড়ামির শক্ত ভাষায় সমালোচনা করেন। তিনি সেসব আলিমদের তিরস্কার করেছেন, যারা সূর্য, চন্দ্র ও পৃথিবী একই লাইনে হয়ে গেল সূর্যগ্রহণ হয়—জ্যোতির্বিদদের এই বর্ণনাকে অস্বীকার করে। তিনি বলেন, এমন জিনিস যা বুরহান (demonstrative evidence) দ্বারা নিশ্চিত, তাকে অস্বীকার করা দীনের জন্য চরম ক্ষতি বয়ে আনবে।


সাধারণত কোনো বিজ্ঞানের ঐতিহাসিককে একটা পপুলার বিশ্বাস ব্যাখ্যা করতে বলা হলে এমন উত্তর আসে, যা শুনে সকলে হতবাক হয়ে যায়। বেশিরভাগ সময়ই উত্তর হয় ওয়াইডস্প্রেড বিশ্বাসের সম্পূর্ণ বিপরিত। প্রফেসর জন হেডলি ব্রুক যেমন বলেছেন,

Most theories in History of Science tend to be false

প্রফেসর হিবরন একটি লেকচারে গুনে গুনে এমন ৭৫টি মিথের কথা উল্লেখ করেন। বিজ্ঞানের ইতিহাস নিয়ে কাজ হচ্ছে মাত্র ১০০ বছর। তাও মূল যে জার্নাল, সেটা পজিটিভিস্টিক। এখনও অনেক দূর যাওয়া বাকি এখানে।


দর্শন

তাহাফুতুল ফালাসিফা কি আসলেই দর্শন বিরোধী বই? একদম না। আবারও, নাম দ্রষ্টব্য। এটা নির্দিষ্ট দার্শনিক চিন্তা বিরোধী বই। তাও আবার নির্দিষ্ট দার্শনিক বিরোধী বইও না। যা ইমাম গাজালি শুরুতেই স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন,

সেরা ও বিখ্যাত দার্শনিকরা ধর্মীয় নীতি (শরিয়া) অস্বীকার করার অভিযোগ থেকে মুক্ত। বরং তারা আল্লাহ এবং শেষ নবির উপর বিশ্বাস রাখেন। তবে সেকেন্ডারি কিছু বিষয় বুঝতে না পেরে সেসবে কনফিউশনে ভোগে। তারপর ভুল করে বসে আর সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়


ইমাম গাজালি তার আগের আশআরিদের সমালোচনা করেন এ বলে যে, তারা যুক্তির মাহাত্ম্য বুঝতে পারেনি। তারা নকল (উদ্বৃতি, টেক্সট। এখানে অহি বোঝানো উদ্দেশ্য)-কে অধিক গুরুত্ব দিয়ে আকল (বিবেক, বিবেচনাবোধ)-কে কম গুরুত্ব দেয়। যার কারণে অসংখ্য সমস্যার উদ্ভব হয়।

তিনি বলেন, অন্যান্য আশআরিদের বুদ্ধিবৃত্তিক বুঝ কম ছিল বলে তারা যুক্তি আর অহিকে সমান ও ভারসাম্যপূর্ণভাবে প্রয়োগ করতে পারেনি। তারা বুঝেনি যে, মূলত আকল (মস্তিষ্কপ্রসূত) ও নকল (অহিপ্রসূত) এর মাঝে বিরোধ বলতে কিছুই নেই। বুরহান (demonstrative evidence) প্রয়োগ করলে তার মতে, ইসলামে যত মতবিভেদ আছে সব শেষ হয়ে যেত।


গাজালি পুরোপুরি অ্যারিস্টটল বিরোধীও ছিলেন না। তিনি তাহাফুতে ২০টা পয়েন্টের সমালোচনা করেন। তিনি এ বলে সব উড়িয়ে দেননি, যে এসব ‘কুরআন-হাদিস বিরোধী’। বরং তিনি প্রতিটি বিষয় ফিলোসফিক্যালি ভুল প্রমাণ করেছেন। আসলে তার উস্তাজ ইমাম জুওয়াইনি বিভাজন করে দেখিয়ে দিয়েছিলেন কোনগুলো কুরআন-হাদিস (নকল) দিয়ে জানতে হবে আর কোনগুলো পুরোপুরি যুক্তি (আকল) দিয়ে জানতে হবে। যদি দার্শনিকদের কথাবার্তা বুরহান (Demonstrative Evidence) দ্বারা প্রমাণিত হতো, তাহলে ইমাম গাজালি সেগুলো মেনে নিতেন। গাজালির মৃত্যুর ৪০ বছর পর আল-মিকলাতি নামের এক মুতাজিলা ধর্মতাত্ত্বিক ইবনু সিনার উপর সমালোচনা লেখেন। সেটা দেখলে বোঝা যায় যে ইমাম গাজালি কত কিছু ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি দর্শনের অনেক কিছুই মেনে নেন, যেটা মিকলাতি মানতে পারেননি। ১৩শ শতক যেতে যেতে আশআরিরা মুতাজিলাদের চেয়েও অধিক র‌্যাশনালিস্টিক হয়ে উঠে। গাজালির স্টাইলে বললে, মিকলাতি যুক্তির সঠিক প্রয়োগ বুঝেননি।


ইমাম গাজালি দার্শনিকদের বিরুদ্ধে তাকলিদ (blind imitation) এর অভিযোগ এনে বলেন যে, এসবের কোনোটির জন্যই বুরহান (Demonstrative Evidence) নেই। দার্শনিকরা এসব ফলো করেন কেবলমাত্র অ্যারিস্টটল বলেছেন সেজন্য। গ্রিক ফিলোসফি থেকে প্রাপ্ত বিষয়গুলো ক্রিটিক্যালি রিএক্সামিন করা ছাড়াই তারা মেনে নেয়। চিন্তা করুন, দার্শনিকরা হচ্ছে তারা, যারা দাবি করে সবকিছু যুক্তি দিয়ে করার। আর ইমাম গাজালি একজন ধর্মতাত্ত্বিক হয়েও তাদের বিরুদ্ধে অন্ধ অনুসরণের অভিযোগ আনছেন।


গাজালি মারা যাওয়ার কিছুদিন আগেও দর্শন নিয়ে লিখেছিলেন। ইমাম গাজালির পূর্বে মুতাকাল্লিমরা ফালসাফার (দর্শনের) সঙ্গে বেশি এনগেজ করত না। তাহাফুত লেখার পরই মূলত তাদের দর্শনচর্চায় গভীরতা আসে। তাহাফুত, কালাম আর ফালসাফা -কে একত্রে নিয়ে আসে। গাজালির পরপর মাদরাসাগুলোও দর্শনচর্চার কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এ সময়েই প্রথমবারের মতো এমন সব মানুষ সৃষ্টি হয়, যারা একইসাথে কালাম আর ফালসাফাতে দক্ষ ছিল। পারতপক্ষে তখন মাদরাসাগুলোতে দুটো সাবজেক্টই পড়ানো হতো।


ইমাম গাজালির ম্যাগনাম ওপাস ইহয়াউ উলুমিদ দীন- এর ২২ নং অধ্যায় পড়লে আপনার মনে হবে—ইসলামি আধ্যাত্মিকতার উপর এটাই সেরা রচনা। বাস্তবতা হচ্ছে এটা সরাসরি নিওপ্লাটোনিক দার্শনিক ইবনু মিসকাওয়াইহ থেকে নেওয়া। যার মূল রিপ্রেজেন্টেটিভ ইবনু সিনা। এটাতো কেবল একটা উদাহরণ, এরকম অসংখ্য উদাহরণ দেওয়া যায়। গাজালির দর্শন ও ধর্মতত্ত্ব অনেকটাই avicennism। তাই স্কলারদের মাঝে আসলে একটা ডিবেট দেখা যায় যে, গাজালি কি আশআরি মতবাদের দিকে বেশি ঝোঁকা ছিলেন না বেশি avicennian-এর দিকে। তবে অন্তত এটুকু নিশ্চিত, যে আত্মা, নবুয়ত ও অস্তিত্বের স্বরূপতত্ত্ব (ontology) এর ক্ষেত্রে তিনি ইবনু সিনার অনুসারী ছিলেন। আবার কেউ এমন ধারণা করবেন না যে, এসব ওয়েস্টার্ন স্কলারদের বিকৃতকরণ বা কিছু। ইমাম গাজালির জীবদ্দশা থেকেই ব্যাপারটা এমন। উদাহরণস্বরূপ, তার শিষ্য ইবনুল আরাবিও এটা বলেন। পরবর্তীতে ইবনু তাইমিয়্যাও গাজালিকে ইবনু সিনার অনুসারী বলে আখ্যায়িত করেন। অবশ্য ইবনু তাইমিয়্যা মারা যাওয়ার পর অন্যান্য আলিম তাকেই ইবনু সিনার অনুসারী বলে দেন। ইবনু তাইমিয়্যা অনেক কাজের ক্ষেত্রে গাজালির সহায়তা নিয়েছিলেন, তার গ্রন্থসমূহের মধ্যে অন্ততপক্ষে গাজালির ২৪ টা বইয়ের নাম সরাসরি পাওয়া যায়। বুগয়াতুল মুরতাদ গ্রন্থে তিনি গাজালির বহু বই থেকে বড় বড় অংশ নিয়েছেন এবং সেসব আলোচনা করেছেন। কিন্তু তিনি গাজালির ব্যাপারে অত্যন্ত শক্ত ভাষাও প্রয়োগ করেছিলেন। বিশেষ করে গাজালির এই টাইপের স্টেটমেন্ট এর উপর—যে গ্রিক লজিক বুঝে না, তার থেকে দীনের কোন জ্ঞান নেওয়া যাবে না।


এতকিছুর পর যদি কেউ এসে বলে যে, গাজালি দর্শন-বিরোধী ছিলেন, তাহলে তার জ্ঞান ও বিবেক-বুদ্ধির উপর আপত্তি করা আশা করি—অপরাধ বলে গণ্য হবে না।


ইমাম গাজালির শেষকথা হচ্ছে, দার্শনিকদের যেসব মত কুফর, সেগুলোকে গ্রহণ করার প্রশ্নই আসে না। বরং ঘৃণা করতে হবে। বিদআত কে বাতিল ঘোষণা করতে হবে। তবে, তাদের এই ভ্রান্তি থেকে সত্য বের করতে আমাদের উৎসাহী হতে হবে। কারণ স্বর্ণের খনিতে ধুলাবালি আর অকেজো পাথরও থাকে। দার্শনিকদের থেকে নেওয়া অনেক শিক্ষা কাজেরও হতে পারে। শরিয়ত বিরোধী নয় এবং উপকারী—এমন তত্ত্বগুলো মুসলিম উম্মাহকে গ্রহণ করতে হবে। তাদের দার্শনিক ভিত্তি, তাদের আকিদা যেমনই হোক না কেন! প্রতিটা শিক্ষাকে আলাদাভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। তারপর শরিয়ত-বিরোধী না হলে এবং উপকারী মনে হলে, সেটা গ্রহণ করতে হবে।

৪৪১ বার পঠিত

লেখক পরিচিতি

আরমান ফিরমান। বিজ্ঞান, দর্শন ও ধর্মতত্ত্বের ইতিহাস নিয়ে স্টাডি করেন। গবেষণামূলক প্রবন্ধ লিখতে ভালোবাসেন। মুসলিম বিজ্ঞানীদের নিয়ে লেখা প্রথম বই গার্ডিয়ান পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত হবে।

মন্তব্য

১ টি মন্তব্য করা হয়েছে
আবিদুর রহমান

আবিদুর রহমান

০৯ নভেম্বর, ২০২০ - ০১:৫৯ পূর্বাহ্ন

অনেক কঠিন বিষয়। তবে তারপরও বিষয়টা পড়ে খুব ভালো লেগেছে। ইমামের উপর যাদের আপত্তি ছিল, তা দূর হয়েছে।

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
ahuemixexodo

ahuemixexodo

১৮ জানুয়ারী, ২০২১ - ০১:১৬ পূর্বাহ্ন

http://mewkid.net/when-is-xuxlya2/ - Buy Amoxicillin <a href="http://mewkid.net/when-is-xuxlya2/">Amoxicillin Online</a> tjc.lstk.chintadhara.com.fbh.is http://mewkid.net/when-is-xuxlya2/

oxiyasa

oxiyasa

১৮ জানুয়ারী, ২০২১ - ০১:৫৮ পূর্বাহ্ন

http://mewkid.net/when-is-xuxlya2/ - Amoxil <a href="http://mewkid.net/when-is-xuxlya2/">Amoxicillin Without Prescription</a> wou.eigv.chintadhara.com.phy.jy http://mewkid.net/when-is-xuxlya2/

মন্তব্য করুন

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

এ রকম আরও কিছু লিখা

এই সাইটের বেটা টেস্টিং চলছে...