মানুষ কোথায়, মানুষ?

অন্ধকার ঘর। কে যেন ধীরে এসে পাশে বসল। কে সে? মানুষ? কি করে বুঝব?

বিজ্ঞান বলে—না, এভাবে টের পাওয়া যাবে না। হাতড়ে, কিংবা আকার-আকৃতি জেনে নিয়ে বুঝতে হবে, সে মানুষ কি না। সমাজবিজ্ঞান আরেকটু খুঁড়তে চাইবে হয়তো। আকার মানুষের, যদি হাঁটে চার পায়ে? কিংবা খুলির আকৃতি যদি বর্তমান যুগের মানুষের খুলির মতো না হয়? সমাজবিজ্ঞানীরা তখন বলবেন—মানুষ বটে, তবে কোন কালের মানুষ সেটা ভেবে দেখতে হবে। ধর্ম বলবে, আচার-ব্যবহার কেমন? সে নিজে জানে যে, সে মানুষ কি না? কোথা হতে এসেছে, কোথায় যাবে, কি তার দায়িত্ব-কর্তব্য-অধিকার ইত্যাদি ইত্যাদি... এ সব ঠিকঠাকমতো জানলে, তবেই সে মানুষ। তার মানে, আকারে-আকৃতিতে মানুষ হলেই শুধু চলবে না, তাকে নিজের আর সমাজ কিংবা ধর্মের আয়নায় প্রতিফলিত হতে হবে। ঠিক আকারে, ঠিক বর্ণে, ঠিক আচরণে। মজার ব্যাপার এসব ‘ঠিক’-এর সংজ্ঞাও ধর্মভেদে, সময়ভেদে, সমাজভেদে বদলে যায়।


বাচ্চারা সারাদিন নানানরকম কাজ করে। ছবি আঁকছে। হঠাৎ শুনি একজন আরেকজনকে বলছে, ‘আচ্ছা মানুষ রঙটা হচ্ছে না কেন?’। চমকে উঠে ভাবলাম, তাই তো। এই রঙটার আর কোনো নাম নেই। গোলাপি, বাদামি, আর সাদার নানা অনুপাতের মিশ্রণে হরেক রকম রঙ এ মানুষের গায়ে। চিনতে হলে এ রঙের নাম দিতে হবে। তাই ‘মানুষ রঙ’-ই সই।


অন্ধকার ঘরটায় ফেরত যাই। মন কি বলে? কথা না বলে, স্পর্শ না করে এমনকি না দেখেও বলা যাবে, পাশে যে এসে বসেছে সে মানুষ। ঘ্রাণে, উত্তাপে কিংবা অদৃশ্য কোন তরঙ্গে মানব সন্তান তার অস্তিত্বের বাষ্প ছড়ায়, ছাপ রেখে যায়। হৃদস্পন্দনে মানুষ চেনা বিজ্ঞানের কাজ, আর সে হৃদয়টা বুকে না মাথায় থাকে এর সমাধান বিজ্ঞান দিতে চায় না। কোনো অপ্রত্যাশিত সুখ বা দুঃখের আবিষ্কারে কেন কড়াৎটা বুকেই করে? কেউ জানে না, কোন ব্যখ্যা নেই এর। হ্যাঁ, বিজ্ঞান বলে ঠিকই যে স্নায়ুরজ্জু নাকি অকস্মাৎ অনুভূতি বয়ে মস্তিষ্কে নেয়, সেখান থেকে এসে হৃদযন্ত্রের কড়াৎটা ঘটায়। কিন্তু এই বিজ্ঞানই তো রোজ রোজ নিজের সব সংজ্ঞাকে বদলে দিচ্ছে, সীমানা নতুন করে নির্ধারণ করছে।


তবু বুকের ভেতর কিংবা শক্ত করে ধরা হাতটায়, অথবা অচেনা ক্লান্ত কোন মানুষের চোখের ভাঁজে আমরা মানুষ খুঁজে পাই। মনের মধ্য থেকে আমাদের মধ্যকার মানুষটা উঁকি দেয়। যে জানালায় তার বাস, মনের সে জানালার পরিধিতে যার মধ্যে যদ্দুর মানুষ দেখে, তাকেই মানুষ ডাকে। নিজের জানালার মাপে, অন্যদের মেপে দেখে। যার সে জানালা যত বড়, জীবনের ক্ষুদ্র সময়ে সে তত বেশি মানুষকে স্পর্শ করতে পারে।


এই আমাদের পরিচয়, আমরা মানুষ। কারণ, আমরা নিজেদের মানুষ ডাকার মতো ইচ্ছেটুকু করতে পারি।


৬৭০ বার পঠিত

লেখক পরিচিতি

মারদিয়া মমতাজ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। বর্তমানে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক। দুই সন্তানের জননী। ইসলাম ও নারী শিক্ষা বিষয়ে গবেষণা ও লেখালেখি করতে ভালোবাসেন। তার অনূদিত প্রথম গ্রন্থ উস্তাদ নোমান আলী খানের লেখা রিভাইভ ইয়োর হার্ট গার্ডিয়ান পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত হয়েছে।

মন্তব্য

১ টি মন্তব্য করা হয়েছে
মাহমূদুল হাসান

মাহমূদুল হাসান

০৮ এপ্রিল, ২০২০ - ০৭:১৩ পূর্বাহ্ন

প্রবন্ধের গূঢ়তত্ব আমি তেমন বুঝি না, পাঠ শেষে মাথাটা বড্ড ফাকা ফাকা লাগে । আমিও জানতে চাই, মানুষের রঙ আসলে কোনটি???

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

মন্তব্য করুন

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

এ রকম আরও কিছু লিখা

এই সাইটের বেটা টেস্টিং চলছে...