সাইয়েদা

এক.

পা-জোড়া মন্থর গতিতে চলছে। গায়ের বোরকাটা বহু পুরোনো। জীর্ণশীর্ণ। আজই প্রথম বেরিয়েছে সে; ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে। নিদারুণ এক অসহায়ত্ব ঘিরে রেখেছে তাকে। এমন করে আত্মমর্যাদার গাঢ় চাদরখানি সরিয়ে একদিন শহরের অলিগলি ঘুরতে হবে কে জানতো! বাবার সেদিনের দুঃস্বপ্ন যে এত দ্রুতই সত্যিকারের ঝঞ্ঝা হয়ে দেখা দেবে, সেটাই বা কে ভেবেছিল! এইতো ক-দিন আগেই, দিল্লির এককোণে তাদের কী সুখের জীবন ছিল। তারপর এক অকস্মাৎ ঝড়... বুকের গভীর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস এসে মিশে যায় উড়তে থাকা ধুলোয়। ভুলতে পারে না সে-ই বিভীষিকাময় রাতটির কথা।


সে-ই রাতে ব্যর্থ হয়েছিল সে, ভীষণভাবে। পরিকল্পনা সফল হয়নি তার। হতাশ হয়ে ফিরে আসে। সদর দরজাটা হাট করে খুলে রেখে গেছে কেউ। প্রথমে সে অবাক হয়। পরক্ষণেই চমকে ওঠে—মেঝেতে পিচ্ছিল কিছুর স্পর্শ পেয়ে। দ্রুত আলো জ্বেলে দেয়। ভয়ে, আতংকে গা হিম হয়ে আসে তার। মেঝেতে তার মায়ের নিষ্প্রাণ দেহখানি পড়ে আছে। দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন মাথা পড়ে আছে খানিক দূরত্বে। চুইয়ে চুইয়ে রক্ত পড়ছে। নিথর হাতের মুঠোয় একটুকরো কাগজ। কাঁপা কাঁপা হাতে মুঠোর ভেতর থেকে কাগজটা হাতে নেয়। একটি চিরকুট।


এ তোমার দুঃসাহসী পরিকল্পনার পরিণাম, জাকিয়া। তোমার কাছে পৌঁছানোর পথে তোমার মা-ই একমাত্র বাধা ছিল। তুমি আমাকে হত্যার পরিকল্পনা করেছ, আমি তোমার মাকে সরিয়ে দিয়েছি। এখন আর কোনো বাধা রইল না। এখন আমরা দিল্লি ছেড়ে চলে যেতে পারি দূরে কোথাও।


চিরকুটের শব্দগুলোর দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকে সে। উদ্ভ্রান্ত-দৃষ্টিতে। তার ভেতর ঝড় ওঠে কান্নার, কিন্তু সে কাঁদতে পারে না। লোকজন ডাকতে ইচ্ছে করছিল, অসহায়বোধ করছিল সে। সেই বোধ পুরোপুরি গ্রাস করার আগেই, অকস্মাৎ কে যেন মুখ চেপে ধরে তার। জ্ঞান হারায় সে।



দুই.

১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দের ১০ মে। সাইয়েদ নুরুল হুদা তার স্ত্রী-কন্যাকে ডেকে জানালেন গতরাতের স্বপ্নের কথা। তিনি স্বপ্নে দেখেছেন—আসমান থেকে আগুনের গোলা জমিনে আছড়ে পড়ছে। ঘরবাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। দেশের উপর ভয়ানক কোনো বিপদের আশংকাও জানালেন তাদের। এরপরই বিদ্রোহ শুরু হয়।


১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দের ৩১ মে পুরো ভারতে বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন জ্বেলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যোগাযোগের ব্যবস্থা করা হয় এক আশ্চর্য উপায়ে। রুটির ভেতরে পত্র পুরে। বিদ্রোহের পূর্বে এবং বিদ্রোহ চলাকালীন সময়ে, মুসলমান সিপাহিদের এভাবে পত্র মারফত অনুপ্রেরিত করেছেন বহু পীর-দরবেশ-ফকির। তাদেরই একজন ছিলেন সাইয়েদ নুরুল হুদা। কিন্তু ৩১ মে আসার আগেই তীব্র অরাজকতা শুরু হয়েছিল। সমগ্র ভারতে ছড়িয়ে পড়েছিল দ্রোহের আগুন। বিদ্রোহের সূত্রপাত ঘটে মিরাঠে, ১০ মে। পরদিন, ১১ মে বিদ্রোহী সিপাহিরা দিল্লি আক্রমণ করে দখলে নিয়ে নেয়। কিন্তু... ব্রিটিশরা এই বিদ্রোহ দমন করে কঠিনভাবে। কয়েক মাসের মধ্যে কর্তৃত্ব পুনরায় তাদের হাতে চলে যায়। সম্রাট হুমায়ুনের সমাধি থেকে গ্রেফতার হন সুলতান বাহাদুর শাহ জাফর। শহরে তুমুল লুটপাট শুরু হয়। বিদ্রোহের সাথে সম্পৃক্ততার লেশমাত্র পেলেই গ্রেফতার হচ্ছে যে কেউ।



তিন.

হাঁটতে হাঁটতে শহরের শেষ মাথায় এসে উপনীত হয় জাকিয়া। সামনে দেখতে পায়—একটা মাহফিল। বেশ বড়। সেখানে একজন বক্তা নবি-পরিবারের মর্যাদা, তাঁদের প্রতি ভালোবাসা আর খেদমতের বড় বড় বয়ান করছে। জাকিয়ার সে-ই ভীষণ অসহায়বোধটা আবার ফিরে এসেছে। নবি-পরিবারের নাম বেচে লোকগুলো জলসা করছে। অথচ সেই সম্মানিত বংশের একজন নারী পথে পথে ঘুরছে।


বাবার মৃত্যুর পর থেকে জাকিয়ার জীবনাকাশ ছেয়ে গেছে দুঃখের কালো মেঘে। বাবা, সাইয়েদ নুরুল হুদার শহিদি মৃত্যুর কথা মনে পড়ে তার। মনে পড়ে সে-ই সময়টার কথা, যখন দিল্লিতে মানুষের আনাগোনা কমে গিয়েছিল। অধিকাংশ মানুষই পালিয়ে গিয়েছিল অন্য শহরে। সেদিন শোকের জগদ্দল পাথরটা বুকে চেপে রেখে তারা মা-মেয়ে মিলে, বাড়ির উঠোনে দাফন করেছিল বাবাকে। পরণের রক্তাক্ত কাপড়েই। সেদিন পুরো ঘটনাটি ঘটেছিল তার চোখের সামনে। হাঁটতে হাঁটতে তখনকার ঘটনাগুলোই চোখের উপর বুলিয়ে নিচ্ছিল সে।


বিদ্রোহের পর...


লালকেল্লার শেষ মোঘল-প্রদীপটাও নিভে গেছে। পতন ঘটেছে তৈমুরি সাম্রাজ্যের। রাজপরিবারের প্রতিটি সদস্য কঠিন পরিণাম ভোগ করছে। বিদ্রোহীদের যারা সাহায্য করেছিল, তাদের ভাগ্যেও নেমে এসেছে দুর্ভোগ। সাইয়েদ নুরুল হুদাও বাদ যাননি সেই তালিকা থেকে। বিদ্রোহ শুরু হওয়ার পর থেকে তিনি ঘরের বাইরে বের হতেন না। বিদ্রোহের আগুন নিভে যাওয়ার পরও না। কিন্তু কোনোভাবে ইংরেজরা তার খবর পেয়ে যায়।


হঠাৎ একদিন একদল ইংরেজ সৈন্য সাইয়েদ নুরুল হুদার ঘরে আসে। তাকে গ্রেফতার করে আর ঘরে লুটপাট চালায়। একজন ইংরেজ অফিসার তাকে প্রশ্ন করে,


: তুমিই কি সেই সাইয়েদ নুরুল হুদা যে বিদ্রোহীদের পত্র মারফত বলেছিল, লাওহে মাহফুজে ইংরেজদের হত্যার কথা লেখা আছে?

: ‘হ্যাঁ, আমিই সেই সাইয়েদ নুরুল হুদা।’ দ্বিধা ছাড়া উত্তর দেন তিনি।

: ‘তাহলে তুমি নিজের অপরাধ স্বীকার করছ?’ বিস্মিত অফিসার আবার প্রশ্ন করলেন।

: ‘পত্র আমি লিখেছি তা স্বীকার করছি, কিন্তু অপরাধ না।’ দৃঢ়তা স্পষ্ট তার গলায়।

: তারমানে বিদ্রোহীদের উসকে দেওয়াকে তুমি অপরাধ মনে করছ না?


উত্তরে সাইয়েদ নুরুল হুদা কিছুই বলেন না। আকাশের দিকে তাকিয়ে হাসেন একটু। তাকে হাসতে দেখে ক্ষেপে যায় অফিসারটি। তারপর যা ঘটার, খুব দ্রুত ঘটে যায়। অফিসারটি সাইয়েদ নুরুল হুদার মুখে তীব্র আঘাত করে। ফিনকি দিয়ে রক্ত পড়তে শুরু করে। এই দৃশ্য দেখে জাকিয়া চিৎকার করে ওঠে, হায়! আমার আব্বু!


সাইয়েদ নুরুল হুদা ঘাবড়ে যাবার লোক নন। চেহারাকে উর্ধ্বমুখী করতেই রক্ত তার গাল বেয়ে বুকে গড়িয়ে পড়ে। ইংরেজ অফিসারটি ভীষণ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। এক সিপাহিকে ইশারা করে সে। সিপাহি তৎক্ষণাৎ তরবারির এক আঘাতে সাইয়েদ নুরুল হুদার মস্তক দ্বিখণ্ডিত করে ফেলে।



চার.

অনন্যোপায় হয়ে কত কি-ই-না করতে হয় মানুষকে—ভাবে জাকিয়া, ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে। একজন সাইয়েদা হয়ে আজ সে পথের ভিখারিনী। পুরোনো দিনের কথা ভাবতে ভাবতে বুকে বিষাদের ছায়া নেমে আসে। বুক ভার হয়ে আসে তার। ইংরেজ সৈন্যরা সেদিন ঘরের জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে গিয়েছিল। ঘরে অবশিষ্ট কিছু আটা-ডালও ফুরিয়ে গিয়েছে পরবর্তী ক-দিনে।

জাকিয়ার প্রস্তাবে মা তাদের প্রতিবেশি এক কবিরাজের কাছে যায়। সাহায্যের জন্য শহরের প্রশাসকের প্রতি জাকিয়ার লেখা চিঠিটা নিয়ে। কারণ জাকিয়া শুনেছে, তাদের এই প্রতিবেশিটির প্রশাসনিক ব্যক্তিবর্গের সাথে ওঠা-বসা আছে।


সেই কবিরাজ লোকটি বয়সে যুবক এবং বেশ অবস্থাসম্পন্ন। জাকিয়ার মা পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে, লোকটিকে সবকিছু খুলে বলে। কিন্তু লোকটি তাকে জানায়, যেহেতু সাইয়েদ নুরুল হুদা বিদ্রোহীদের উসকে দেয়ার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন, তাই তাদের সরকারি সাহায্য পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। এই বলে সে নিজে সাহায্য করার আগ্রহ প্রকাশ করে। কিন্তু জাকিয়ার মা এরকম সাহায্য নিতে প্রস্তুত নন। তিনি বলেন, কাজের বিনিময়ে পারিশ্রমিক ছাড়া অন্য কোনো সাহায্য তিনি প্রতিবেশি লোকটির কাছে চান না।


: ‘তাহলে তোমার মেয়েকে বলো, আমার কিছু বইপত্র সংক্রান্ত কাজ করে দিতে। তার পরিবর্তে আমি তোমাদের দু-বেলার খাবার আর সব খরচও দেবো।’ লোকটি বললো।

: জাকিয়ার মা রাজি হয়ে যান।


পরদিন থেকে কবিরাজের বাসায় মা-মেয়ে কাজ শুরু করে। আলাদা একটি কক্ষে, সকাল থেকে সন্ধ্যা। এভাবে তাদের দিনগুলো ভালোই যাচ্ছিল। একদিন কাজ করার সময় অন্যসব কাগজের সাথে জাকিয়া একটি চিঠি পায়। তাতে লেখা—


কবিরাজের তাবিজ এসে পৌঁছেছে। আমরা নির্দেশনানুযায়ী কাজ করতে প্রস্তুত আছি। পাঞ্জাব থেকে ধোনি এসেছে। সাইয়েদ নুরুল হুদা সম্পর্কে আপনি যা লিখেছেন, বুঝেছি। তাকে তার কারামত অনুযায়ী নজরানা দেওয়া হবে। নানারকম কষ্টে আছি। আগেরবার আপনি কাশ্মীরের এক কবিরাজের ঠিকানা দিয়েছিলেন। এখন কাশ্মীর আমাদের উপকার পাবে।


ইতি

আপনার ভক্ত—এনএন



জাকিয়া কিছুক্ষণ থম মেরে বসে থাকে, চিঠি হাতে। চিঠির বিষয়বস্তু বুঝে উঠতে সময় লাগে তার। দীর্ঘক্ষণ পর সে বুঝতে পারে চিঠিটার লেখক জেনারেল নিকলসন। ধীরে ধীরে সে আরও বুঝতে পারে, এই প্রতিবেশি লোকটিই ইংরেজদেরকে তার পিতার কথা জানিয়েছিল। তার দেওয়া তথ্যের উপর ভিত্তি করেই সেদিন সৈন্যরা জাকিয়ার বাবার কাছে পৌঁছাতে পেরেছে।


ঝিমঝিম করে মাথার ভেতরটা। জাকিয়ার মনে হয়, যেন একটা দুঃস্বপ্ন দেখে উঠলো এই মাত্রই। আর দেরি করে না সে। পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নিতে মনস্থির করে। পরদিনই সে রাতের বেলা কবিরাজের ঘরে যায়। ছুরি হাতে। তাকে ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যা করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু তার ঘরে উপস্থিত হয়ে কাউকে দেখতে পায় না। হতাশ হয় জাকিয়া। সেই রাতে সে ব্যর্থ হয়েছিল ভীষণভাবে । পরিকল্পনা সফল হয়নি তার...



পাঁচ.

যখন জাকিয়ার জ্ঞান ফিরল, নিজেকে সে অচেনা একটা জায়গায় আবিষ্কার করল। সম্মুখে কবিরাজকে দেখতে পেয়ে চমকে ওঠে। কবিরাজ তাকে জানায়, তারা এখন আম্বালা শহরে আছে। জাকিয়া দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে বলে ওঠে—


: আমি একজন সাইয়েদা। না মাহরাম হয়েও আমার সামনে আসার জন্য লজ্জিত হওয়া উচিৎ আপনার! সরে যান সামনে থেকে।

: সমস্যা নেই, এখনই বিয়ে হয়ে যাবে আমাদের আর মাহরাম হয়ে যাবো।


জাকিয়া দু-হাতে মুখ ঢেকে নেয়। তার মনে পড়ে যায় মায়ের হাতে পাওয়া চিরকুটটির কথা। এই বিশ্বাসঘাতক লোকটাই লিখেছিল। পৃথিবীর নিকৃষ্টতর প্রাণি মনে হতে লাগল লোকটাকে। তার বাবার মৃত্যুর জন্য দায়ি লোকটি, মাকে হত্যা করেছে তার উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য। জাকিয়া সেই চিরকুটের কথামতো সে দিল্লি থেকে দূরে নিয়ে এসেছে জাকিয়াকে। দুশ্চিন্তার ঢেউ তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে থাকে বর্তমান থেকে অতীতে, ভবিষ্যতের তীরে।


এরমধ্যেই জাকিয়া শুনতে পায়, কেউ একজন কবিরাজকে গাল দিচ্ছে। তার পরপরই শোনা যায়, কবিরাজের আর্তচিৎকার। মুখ থেকে হাত সরালে সে দেখতে পায়, কবিরাজের এক ভৃত্য তাকে হত্যা করেছে। ভৃত্যটি জাকিয়াকে তাড়া দিয়ে বলে—দ্রুত পালান এখান থেকে! আমি আপনাকে রক্ষা কর‍তে এসেছি!


তারপর জাকিয়া সেই ভৃত্যটির সাথে প্রথমে তার বাড়িতে যায়। কিন্তু পুলিশ সে বাড়িতে হানা দেওয়ায় সেখানেও থাকা সম্ভব হয়নি। পুলিশের ভয়ে কবিরাজের ভৃত্যটি পালিয়ে গেলে পুলিশ তার ঘর নিলামে তুলে দেয়। তাই তার বৃদ্ধা মায়ের সাথে জাকিয়া সে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে আশ্রয়ের খোঁজে। তারপর ভাগ্য তাকে কত না নির্মমতা দেখায়! সাথের বৃদ্ধাটিও মারা যায় আশ্রয় খুঁজতে গিয়ে। কত শহর, কত পথ ঘুরে। এখন কবরস্থানের পাশে এক ফকিরের ঝুপড়িতে থাকে জাকিয়া। ফকির ভিখ মেঁগে যা পায়, তা দিয়েই চলে। সে ফকিরের অসুখ করেছে। অপারগ হয়ে আজ তাই জাকিয়াকে ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে হাঁটতে হচ্ছে।



ছয়.

শহরের শেষ প্রান্তের জলসাটির কাছে গিয়ে উপস্থিত হয় জাকিয়া। বক্তা আক্ষেপ করে বলছে, আফসোস! আমরা যদি কারবালা প্রান্তরে উপস্থিত থাকতে পারতাম! আমাদের জান-মাল যদি আহলে বাইতের জন্য উৎসর্গ করতে পারতাম! আমরা তো তাঁদেরই গোলাম। ক্রোধ ধরে রাখতে পারলো না সে। লোকজনকে উদ্দেশ্য করে জোর গলায় বলতে শুরু করল, ‘আমার কথা শুনুন একটু।’


উপস্থিত সকলেই যারপরনাই বিরক্ত হয়। বক্তার গলায়ও রাগ ও বিরক্তি স্পষ্ট—কেমন বেত্তমিজ মহিলা!


‘আমার কথা শুনুন! আমি একজন সাইয়েদা।’


সবাই নিশ্চুপ হয়ে যায়।


সাইয়েদা জাকিয়া উপস্থিত সবাইকে বক্তার আক্ষেপের অসারতা সম্পর্কে বলে। সে বলে যেতে থাকে, ‘তোমাদের এসব জাঁকজমক তোমরা আহলে-বাইতের নামে করে চলেছো, অথচ বাস্তবতা হচ্ছে তাঁদের দুঃখ-কষ্টে তোমাদের কারো সহমর্মিতাটুকুও জাগে না। সবকিছুই তোমাদের লোক-দেখানো, দুনিয়াবি স্বার্থপরতা। না, এগুলো নবি-পরিবারের খেদমত না। এই মজলিসে তোমরা অঢেল পয়সা ঢালছো, এর কতটুকু আলে মুহাম্মাদের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ওয়ারিসদের দিচ্ছো? ক-জন সাইয়েদ-সাইয়েদার খোঁজ রাখছো তোমরা?’


কেউ কোনো কথা বলে না।


‘চুপ করে আছো কেন তোমরা? উত্তর নেই? কী উত্তরই বা দেবে তোমরা?’—চিৎকার করে জাকিয়া।


‘কাল কিয়ামতের মাঠে যখন আল্লাহ তোমাদের কাছে উত্তর চাইবেন, কীা বলবে তোমরা? কী প্রমাণ দেবে সেই মুহাব্বাতের, যা কাজে প্রতিফলন করতে পারছো না?’


পুরো মজলিসে স্তব্ধতা নেমে আসে। কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ হয়ে যায় সবাই। কেউ কিছু বলতে পারে না। মজলিস থেকে সরে আসে জাকিয়া। মেঘের মতো কালো ছায়া ভেতর ধারণ করে একজন সাইয়েদা ধীরপায়ে ফিরতি পথ ধরে—তার ছোট্ট ঝুপড়ির পথ।


পরিশিষ্ট : পরবর্তীতে সাইয়েদা জাকিয়ার বিয়ে হয় সম্ভ্রান্ত এক সাইয়েদের সাথে। বিয়ের পরে জাকিয়ার ঝুপড়িটির জায়গায় সেই সাইয়েদ ঘর তোলে। বাকি জীবন তাদের সেখানেই কাটে। জাকিয়া সেখানে থেকে মহিলাদেরকে নসীহত করতো। ধীরে ধীরে সে জাকিয়া বিয়াবানি নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে।




তথ্যসূত্র :
বেগমাত কি আঁসু— খাজা হাসান নিজামি
চেপে রাখা ইতিহাস— গোলাম আহমাদ মোর্তজা


১৮৮ বার পঠিত

লেখক পরিচিতি

এখনও পড়াশোনা করি। অ্যাকাডেমিক পড়াশোনার বাইরে সাহিত্যপাঠে সময় কাটাই। আর একটু-আধটু লিখি।

মন্তব্য

৩ টি মন্তব্য করা হয়েছে
রোবায়েত হাসান

রোবায়েত হাসান

২৩ নভেম্বর, ২০২০ - ২৩:৩৬ অপরাহ্ন

গদ্য-স্টাইলটাই দারুন। মাশাল্লাহ।

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
আবির রায়হান

আবির রায়হান

২৩ নভেম্বর, ২০২০ - ২৩:০৬ অপরাহ্ন

রুদ্ধশ্বাসে পড়ে ফেললাম। এমন লেখা আরও চাই।

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
আবু আহনাফ

আবু আহনাফ

২১ ডিসেম্বর, ২০২০ - ১২:৩৯ অপরাহ্ন

হৃদয় জুড়ানো একটি কাহিনী। আল্লাহ আপনার লেখার হাতকে আরো শানিত করে দিক।

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

মন্তব্য করুন

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

এ রকম আরও কিছু লিখা

এই সাইটের বেটা টেস্টিং চলছে...